
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাতদিন পুলিশ সদস্যদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। কাজে যোগ দেওয়ার বিষয়েও নানান শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন তারা। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সহায়তায় কাজে ফিরতে শুরু করেন। বাহিনীটি সচল করতে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পোশাক পরিবর্তন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশ বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ ছিল গোটা দেশের মানুষ। পুলিশ সদস্যদের পোশাকও অনেকের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় সেসময়। আবার পুলিশ সদস্যরা পোশাক পরে বের হতেও সংকোচবোধ করতেন। অনেক পুলিশ সদস্য ট্রমায় ভুগেছেন দীর্ঘদিন। সরকার পতনের পর থেকে আলোচনায় থাকলেও অবশেষে চূড়ান্ত হয়েছে পুলিশ বাহিনীর নতুন পোশাক।
তবে ২০২০ সাল থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছিল। ২০২১ সালের শুরুর দিকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের জন্য বেশ কয়েকটি পোশাকের ট্রায়ালও হয়। তারপরও নানা কারণে নতুন পোশাক পাননি বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা।
পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুলিশের নতুন পোশাক হচ্ছে ‘আয়রন’ রঙের, র্যাবের ‘অলিভ’ আর আনসার বাহিনীর জন্য ‘গোল্ডেন হুইট’।
পোশাকের রং পরিবর্তন করলে বাহিনী পরিবর্তন হয় না। ব্রিটিশ আমলে পুলিশ খাকি পোশাক পরতো। খাকি পোশাক এখনো শ্রীলঙ্কান পুলিশ পরে। তাদের দক্ষতা তো কমে যায়নি। এক কথায় পুলিশ বাহিনীর কর্মক্ষমতার সঙ্গে পোশাকের কোনো সম্পর্ক নেই।- সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা
সোমবার (২০ জানুয়ারি) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
জানা যায়, পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর জন্য যে তিনটি রঙের পোশাক বাছাই করা হয়েছে সেগুলো প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন পেলে আনুষ্ঠানিকভাবে পোশাক দেওয়া হবে মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে।

বিশ্বজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক দুই ভাবে নির্ধারণ করা হয়। দেশ-কালের ওপর ভিত্তি করে সেবা সংস্থাগুলোর পোশাক নির্ধারণ করা হয় বেশিরভাগ সময়। যেমন শীতপ্রধান দেশগুলোর পুলিশের পোশাকের রং হয় কালো রঙের। সেখানে তাপমাত্রা ধরে রাখার একটা বিষয় পোশাকে যুক্ত থাকে।
গরম বা নাতিশীতষ্ণ দেশগুলোতে পুলিশের পোশাক সাদা, খয়েরি বা হালকা রঙের দেখা যায়, যা তাপ শোষণ কম করে। ভারত বা এই অঞ্চলে বিভিন্ন সেবা সংস্থার পোশাক খাকি হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাস।

ব্রিটিশ পুলিশ হাফ প্যান্ট এবং সাদা রং নির্বাচন করেছিল। কারণ এই রঙটি সূর্যের তাপ প্রতিফলিত করে গরম থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে তারা হাফপ্যান্ট পরতো। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক আগেই তা বদলে গেছে।
ইউনিফর্ম পরিবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সব শ্রেণির মানুষ। সমন্বয়করাও কথা বলেছেন বিষয়টি নিয়ে। তবে পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর দায়িত্বশীলরা কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পোশাক পরিবর্তন কসমেটিকস চেঞ্জ। পুলিশের ট্রেনিং, মানসিকতা, কোড অব কন্ডাক্ট এগুলো বেসিক ইস্যু। ইউনিফর্ম কোনো ইস্যু হতে পারে না। স্মার্ট ইউনিফর্মকে সব সময় স্বাগতম। ইউনিফর্ম মেড ইন বাংলাদেশ হতে হবে। ইউনিফর্ম চেঞ্জ করে কোনো ফোর্সের গুণগত পরিবর্তন হবে না বলে আমি মনে করি।- নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী
জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ তার নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পুলিশ, র্যাব আর আনসারের পোশাক পরিবর্তন করার প্রক্রিয়ায় কি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়েছে? আওয়ামী লীগ নেতারা যেহেতু পালিয়ে গেছেন এরা এখন হিসেবের বাইরে। তবু গোনায় ধরলে সরকার তাদের মেইল অ্যাড্রেস জোগাড় করে মতামত চাইতে পারতো। কিন্তু বিএনপি, জামায়াত, কমিউনিস্ট পার্টিসহ সব রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়েই করা উচিত ছিল। যদি নিয়ে থাকে তাহলে ঠিক আছে। এরপরেও তিন পোশাকের একটাও আমার ভালো লাগেনি। র্যাবের পোশাকটা জঘন্য হয়েছে। একজন বলেছে যে, ক্রসফায়ার দিলেও মানুষ বিশ্বাস করবে না যে এই পোশাকে কেউ ক্রসফায়ার দিতে পারে। আমি হাসতে হাসতে শেষ।’

ফুটবলার তকলিস আহমেদ তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘পুলিশ, র্যাব আর আনসারের নতুন ইউনিফর্ম। পোশাক নিয়ে মন্তব্য করার কী আছে, পোশাক থেকে কাজ যদি সঠিকভাবে পালন করেন তাহলে হয়।’
প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোশাক নিয়ে লিখেছেন, ‘নতুন ইউনিফর্মের পেছনে শত কোটি টাকা খরচ না করে র্যাব, পুলিশ, আনসার সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও কাঠামোগত উন্নয়নে পর্যায়ক্রমে অর্থ বিনিয়োগ করুন। সংস্থাগুলোর সদস্যদের দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মানবিক পুলিশিং নিশ্চিত করতে বিশেষ অভ্যন্তরীণ ইউনিট গঠন করে জনসেবামূলক কার্যক্রমে তাদের নিয়োজিত করুন।’
এদিকে পুলিশের পোশাক নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘স্বভাব, চরিত্র, খাসলত পরিবর্তন না করে পোশাক পরিবর্তনে কোনো লাভ নাই। সমস্যা পোশাকে না, পুরো সিস্টেমে।’
পোশাকের বিষয়ে সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, ‘পোশাকের রং পরিবর্তন করলে বাহিনী পরিবর্তন হয় না। ব্রিটিশ আমলে পুলিশ খাকি পোশাক পরতো। খাকি পোশাক এখনো শ্রীলঙ্কান পুলিশ পরে। তাদের দক্ষতা তো কমে যায়নি। এক কথায় পুলিশ বাহিনীর কর্মক্ষমতার সঙ্গে পোশাকের কোনো সম্পর্ক নেই।’

পুলিশের পোশাকের বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘পোশাক পরিবর্তন কসমেটিকস চেঞ্জ। পুলিশের ট্রেনিং, মানসিকতা, কোড অব কন্ডাক্ট এগুলো বেসিক ইস্যু। ইউনিফর্ম কোনো ইস্যু হতে পারে না। স্মার্ট ইউনিফর্ম সব সময় স্বাগতম। ইউনিফর্ম মেড ইন বাংলাদেশ হতে হবে। ইউনিফর্ম চেঞ্জ করে কোনো ফোর্সের গুণগত পরিবর্তন হবে না বলে আমি মনে করি।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে পুলিশকে হত্যাকাণ্ডে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এরপর দাবি ওঠে বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশের পোশাক পরিবর্তন হয়েছে। তবে বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ঘটবে না। পুলিশকে পরিবর্তন করতে পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।’
জুলাই-আগস্টে পুলিশকে হত্যাকাণ্ডে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এরপর দাবি ওঠে বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশের পোশাক পরিবর্তন হয়েছে। তবে বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ঘটবে না। পুলিশকে পরিবর্তন করতে পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।- গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ১৮ ধরনের পোশাকের ট্রায়াল দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে পাঁচ রঙের পাঁচটি পোশাক নির্ধারণ করা হয়। পরে সেখান থেকে তিনটি পোশাক বাছাই করা হয়েছে।
পোশাক পরিবর্তনের যে সিদ্ধান্ত তার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সবার মন-মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। সেজন্য পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তন করা হচ্ছে।
একসময় বাংলাদেশ পুলিশের পোশাকের রং ছিল খাকি। এই রঙের পোশাকের ইতিহাস ব্রিটিশ আমলের সঙ্গে জড়িত। আমাদের এই অঞ্চল যখন ব্রিটিশ শাসিত ছিল তখনই পুলিশ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তবে প্রথম দিকে কোনো নির্ধারিত পোশাক ছিল না। কিছু সময় পর তাদের জন্য সাদা পোশাক করা হয়। কিন্তু এই পোশাক নিয়েও একটা সমস্যা দেখা দেয়, সেটা হলো- পুলিশ সদস্যদের সাদা ইউনিফর্ম পরে ডিউটি করার সময় খুব তাড়াতাড়ি নোংরা হয়ে যেত। এতে ব্রিটিশ পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খুবই বিচলিত হয়ে পড়তেন।
ফলে পোশাকের নোংরা আড়াল করতে পুলিশ সদস্যরা তাদের ইউনিফর্ম বিভিন্ন রঙে রাঙাতে থাকে। ১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ অফিসার স্যার হ্যারি লুমসডেনের পরামর্শে পুলিশের ইউনিফর্ম হালকা হলুদ ও বাদামি রঙের করা হয়।
তারপর চা পাতা, পানি ব্যবহার করে সুতি কাপড়ের রং রঞ্জকের মতো তৈরি করে ইউনিফর্মের ওপর লাগানো হতো। ফলে পোশাকের রং খাকি হয়ে যায়। সেই বছরই পুলিশে খাকি রঙের পোশাক গৃহীত হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা খাকি রঙের পোশাক ব্যবহার করেন। অনেকে অবশ্য সাদা পোশাকেও লড়াই করেছেন। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশের পোশাকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৪ সালে। ওই বছর পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রঙের করা হয়।
জেলা পুলিশকে দেওয়া হয় গাঢ় নীল রঙের পোশাক। র্যাবের কালো ও এপিবিএনের পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রঙের মিশ্রণে। এমনকি ২০০৯ সালেও কিছুটা পরিবর্তন আসে পুলিশ বাহিনীর পোশাকে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution