
চির নিদ্রায় সমাহিত হয়েছেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ও রংপুর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক বিশিষ্ট রাজনীতিক আশরাফ হোসেন বড়দা। শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) বাদ জুমা গুপ্তপাড়া মসজিদে নামাজের জানাজা শেষে তাকে রংপুর নগরীর নূরপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। মৃত্যুকালে এক কন্যাসন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, আত্নীয়স্বজন ও শুভান্যুধায়ী রেখে গেছেন তিনি।
এদিকে মরহুমের জানাজার নামাজে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগ) ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক, রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহাফুজ উন নবী ডন, রংপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আনিছুর রহমান লাকু, রংপুর জেলা যুবদলের সভাপতি নাজমুল আলম নাজু, রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরপিইউজ) সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেকসহ বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক কমিটি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ী, আত্মীয়-স্বজনরাও উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ১৯৩৮ সালের ১২ জুলাই, অবিভক্ত ভারতের আলিপুর দুয়ার জেলার মজিদখানা গ্রামে এক সাদাসিধে পরিবারে জন্ম আশরাফ হোসেন বড়দার। বাবা আব্বাস হোসেন ও মা আমিনা হোসেন। দেশভাগের তীব্র আঁচ তার পরিবারেও পড়ে। নিরাপত্তার খোঁজে তারা বাংলাদেশে চলে আসেন এবং লালমনিরহাটে স্থায়ী হন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার সংগ্রামের গল্প।
শৈশবে আলিপুর দুয়ারের মজিদখানা স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে লালমনিরহাট হাইস্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
আশরাফ হোসেন বড়দা ১৯৫২ সালে লালমনিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ভাষা আন্দোলন অংশ গ্রহণ করার কারণে আশরাফ হোসেন ১৯৫৪ সালে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ১৯৫৫ সাল থেকে রংপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। নগরীর গুপ্তপাড়ার নিউক্রস রোডের ডুয়ার্স ভবন ছিল ভাষাসৈনিক আশরাফ হোসেনের ঠিকানা।
তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও রংপুরের পীরগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মওলানা ভাসানী তাকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
পরে তিনি ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টি গঠন করেন। এই দলের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাত দলীয় জোটে যোগ দেন। এসময় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। জোট ভেঙে গেলে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৭ সালে রংপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও পরে আহ্বায়ক হন। ২০১০ সালে তিনি রাজনীতি থেকে সরে আসেন।
প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রংপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক এবং পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা। আরও শোক জানিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, নাগরিক ঐক্যসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং রংপুর প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ক্লাব রংপুর, সিটি প্রেসক্লাব রংপুর, মাহিগঞ্জ প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন রংপুর, রংপুর রিপোর্টার্স ক্লাব, টিভি ক্যামেরা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন-টিসিএ রংপুর, রংপুর ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন-আরপিইউজেসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন।
শোক বার্তায় নেতারা বলেছেন, ভাষাসৈনিক আশরাফ হোসেন বড়দা ছিলেন একজন অকৃত্রিম অভিভাবক। তার মৃত্যুকে বাংলাদেশ একজন সাহসী সংগ্রামী যোদ্ধাকে হারালো। তিনি একজন মানুষের জীবন কখনো কখনো একটি গল্পের চেয়েও বেশি মর্মস্পর্শী। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, একটি অধ্যায় একটি আদর্শ। একটি নাম—বড়দা।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution