
আমার তিন সহকর্মীসহ মিলে নিজ বাসা থেকে সকাল নয়টায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইমিগ্রেশন উদ্দেশ্যে রহনা দিলাম। সেখানে গিয়ে কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করলাম এবং নাস্তা ও সেড়ে নিলাম। সবার পাসপোর্টের সাথে মিলিয়ে দেখবার জন্য ছবি তোলা হলো, তারপর এন্ট্রি সিল দেওয়া হলো। কিন্তু আমার টা পাসপোর্টটা মিল ছিলো না, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আহসান হাবীব সরকার পলাশ আমাকে একটু ভয়ে দেখালো যে আপনি আর যেতে পারবেন ভারতের দার্জিলিং। আমি ও আমার তিন সহকর্মী সবাই একটু ভয় পাইলাম। পরে ওই ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা বিভিন্ন জায়গায় ফোন দিয়ে খুবই দ্রুত আমার সমস্যটা সমাধান করে দিল। বর্ডারের এই প্রান্ত থেকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে ওয়েল কাম টু ইন্ডিয়া। আমরা হেঁটে হেঁটে বর্ডার ক্রস করলাম, সেই সাথে আমাদের ল্যাগেজ গুলো কোন চেকিং ছাড়াই ঢুকে গেল ভারতে। ওই পাড়ে গিয়েই আধা ঘন্টা খানেক সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকলাম। কোথায় যাবন, কি করি- এই সব প্রশ্ন করতে থাকলেন অফিসার, আমরা সোজা উত্তর দিলাম-দার্জিলিং যাব। এরপর এস আর শ্যামলীর বাসের লোকেরাই একটি দোকানে নিয়ে গেলো যেখান থেকে আমরা বাংলাদেশী টাকা ভাঙ্গিয়ে ইন্ডিয়ান রুপি করে নিলাম। এবার যেতে হবে শিলিগুড়ি, বাসের জন্য আর একটু অপেক্ষা করলাম। এর ফাঁকে একটু চা খাইলাম। তারপর আমাদের এস আর শ্যামলী বাস চলে আসলো এবং চেংরাবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি মাত্র দেড় ঘন্টার পথ, কিন্তু লাগিয়ে দিল পাক্কা দুই ঘন্টা। কারন এই পথে ভারত প্রবেশ জীবনে এই প্রথম। চৌরাস্তার মোড় যখন পাড় হচ্ছিলাম তখন জাকিয়ে বৃষ্টি নামলো, ওদিকে ড্রাইভারের গাড়ির কাঁচ মোছার জন্য নেই কোন ওয়েফার। কোথায় ভয়ে সিটিয়ে যাব তা না,পীচ ঢালা পথ মাড়িয়ে যেন সাদা কোন দ্বীপে ক্রমশ হারিয়ে যেতে লাগলাম। পাশ থেকে একজন বলে উঠলো-এমন বৃষ্টি ,আজ আর দার্জিলিং পৌঁছতে পারবো না। অল রেডি দুটো বাজে।
বাস থেকে শিলিগুড়িতে নেমে আমরা ব্যাগ গুছিয়ে ফেললাম দার্জিলিং যাবার উদ্দেশ্যে একটি মাইক্রেবাসে রহনা দিলাম। নাস্তা করলাম একটি হিন্দু রেস্তোরায়-চাপাতি, ছোলার ডাল আর ডিম ভাজি। ছোট ছোট বাটি একটি স্টিলের থালায় সুন্দর করে সাজানো। এতো ছোট বাটি আমি এর আগে কোন দিন দেখিনি, মনে হচ্ছিল বাচ্চাদের খেলনা ভেঙ্গে আনা হয়েছে। কিন্তু, খাবার মুখে দিয়েই বুঝলাম-অনেক সুস্বাদু। এই শহরে খাবারের বিল এতো কম হয় আগে আমার জানা ছিল না। আমি আয়েশ করে এক কাপ দুধ চা খেলাম। মহানন্দার মোড়েই পেয়ে গেলাম জীপ-টাটা। পাহাড়ি পথে সব ধরণের গাড়ি উঠতে পারে না, তাই বিশেষ জীপের বিশেষ ড্রাইভাররা খুব কনফিডেন্ট থাকেন। আমরা জীপের পিছনের তিনটি সিটে ভাগাভাগি করে বসেছিলাম। মালপত্র যা ছিল সব ছাদে বেঁধে দেয়া হলো। আরম্ভ হলো আমাদের দার্জিলিং ভ্রমণ, আমি বুঝতে পারছিলাম কিছুক্ষন পর পর আমার কান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই বার বার পানি খেয়ে ঢোক গিললাম। মনে হয় এতে খুব কাজ হলো না, এতো উঁচুতে জীবনে আমি কোন দিন উঠিনি। বোকার মতোন পাহাড়ের গাঁয়ে গড়ে ওঠা শহর দেখতে লাগলাম। খাঁদের কিনারা দিয়ে ড্রাইভার যেভাবে কনফিডেন্টলি গাড়ি চালাচ্ছিল, আমি আতংকে বিস্বয়ে হতভম্ব। কিন্তু আমার সঙ্গী সাথীদের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল-ওরা এই পথে এতোটাই অভ্যস্থ যে এটা আর এমন কি ,এর চাইতে হিমালয়ে ওঠা অনেক সহজ !
৭৫০০ ফুট উপরে দার্জিলিং থেকে কেবল মেঘ দেখা যায়
চার চাকার সাদা টাটা যেন উড়ে চলেছে একদম খাড়া পথে পাহাড়ের গা ঘেষে। কেবল উঠছেইতো উঠছে, হঠাৎ ছিমছাম রেল-স্টেশন দেখে আমার চোখ আটকে গেল। নেপালী ড্রাইভারকে অনুরোধ করলাম গাড়িতে ব্রেক করতে, কেবল আমি একাইযে মুগ্ধ হয়ে নেমে গেছি তা নয়, সাথে আমার সহযাত্রী আরো সাত জন। হুম, বলছিলাম "ঘুম" রেলস্টেশনের কথা। পাহাড়ের এত উপরেও যে রেলগাড়ি চলতে পারে তা কেবল সিনেমায় দেখেছি। এবার দু'চোখ ভরে দেখলাম কেমন হেলতে দুলতে ৭০০০ ফিট ছাড়িয়ে যাচ্ছে রেলগাড়ি।
ঘুমে কিছু ছবি তুলে নিলাম জেগে জেগেই। এবার আসল জায়গায় যাবার পালা। ঘড়ির কাটা তখন বেলা বারটা ছুঁয়ে গেছে, জীপ এসে ঠেকলো এক জনবহুল লোকালয়ে। চারদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল এই বুঝি ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসবে।কারন আমরা দার্জিলিং-এর একদম সুউচ্চ চূড়ায় অর্থাৎ প্রায় ৭,৫০০ ফুট উপরে পৌঁছে গেছি, জুন মাসে এখানে সিজন চলে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ থাকে বলে অভিভাবকরা এই সময়টাতেই বাচ্চাদের বেরানোর জন্য নিয়ে আসে। আর কোলকাতা বা দিল্লী যে কোন পথেই দার্জিলিং খুব কাছের একটি পর্যটন কেন্দ্র।
পাহাড়ের গায়ে নগরী
দার্জিলিঙ্গের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে আগেই কিছুটা ধারণা নিয়েছিলাম। তারমধ্যে অবজারভেটরি হিল , সেন্ট অ্যারুজ চার্চ, ওয়ার মেমোরিয়াল, পিস প্যাগোডা, চৌরাস্তা অ্যান্ড দ্য মল, হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেন, পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকাল পার্ক, ধীরধাম মন্দির আছে। জিলাপীর মতোন ঘুরে ঘুরে এবার জীপ নীচের দিকে নামছে। হঠাত মনে হলো দশ মিনিট আমরা একে অন্যকে দেখতে পেলাম না, পরে বুঝলাম মেঘ এসে আমাদের সমস্ত শরীর ঢেকে দিয়ে গেছে, সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস। প্রায় আধ ঘন্টা চলার পর জীপটি ডান দিকে ইউ টার্ন নিল। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম জীপটি চলে যাচ্ছে মিরিক শহরের দিকে যেটা গিয়ে মিশেছে একদম নেপালের বর্ডারের সাথে। আমার ডান পাশে তখন বিরাটাকায় পাহাড় আর বাম পাশে পাইন গাছের লম্বা শারি, মাঝ খানে পীচ ঢালা পথ। মনে হচ্ছিল কে যেন নীল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে আর তার উপর দিয়ে উড়তে উড়তে আমরা ঘন অরণ্যে তলিয়ে যাচ্ছি। নীচের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছিল পাহাড় খোদাই করা শহর, হাজার লোকের বাস যেখানে। স্কুল থেকে ফিরতে থাকা বাচ্চাদের কোলাহল আর গীর্জার টুং টাং শব্দ কানে এসে এক অপরূপ ছন্দে মাতোয়ারা করে দিল নিমিষেই। আমরা নীচে নামতে নামতে মিরিকের একদম স্বচ্ছ হ্রদের কাছে চলে গেলাম।
শুনেছি এবার ঈদে কম করে হলেও আট দিনের ছুটি। ভারতে যাবার জন্য ই-টোকেন বলে নাকি কোন শব্দই নেই, লাইনে দাঁড়িয়ে ছয়শো টাকা জমা দিলেই ট্যুরিস্ট ভিসা। আমার মনে হয় এটাই খুব ভালো সময় দার্জিলিং দেখার। একদিকে মাথার উপরে থাকবে ভরা বর্ষা,আর অন্য দিকে মেঘের আড়ালে সূর্যের খেলা। সময় আসা যাওয়া দিয়ে মাত্র চার দিন, খাবার খরচো খুব বেশি নয়। তাহলে ঈদের এই ছুটিতেই আপনি আপনার চোখের লেন্সে বন্দি করতে পারেন মনে রাখার মতোন রোমাঞ্চকর দার্জিলিং ভ্রমণ।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution