

তরুণী তাওয়ানার ২১ বছর বয়সে গর্ভধারণের কোনও পরিকল্পনাই ছিল না।
তার নিজের ভাষ্যমতে, "তিনি স্বাধীনভাবে জীবন উপভোগ করতে চেয়েছেন", পার্টি করে এবং বন্ধুদের সাথে আনন্দ করে সময় কাটাতে চেয়েছেন।
কিন্তু একদিন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার সব পরিকল্পনা যেন ভেস্তে যায়।
তার শরীর কেন খারাপ হয়ে পড়ে এ নিয়ে ধারণাই ছিল না তার। তারপর হাসপাতাল থেকে তাকে জানানো হয় যে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তার একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে।
তাওয়ানা বলেন, "এ কথা শুনেই আমার প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়ে যায়।"
তিনি যেন চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিলেন।
"কারণ বিষয়টা এমন যে কেউ আপনাকে বলছে, আপনার জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে হাতে আর চার সপ্তাহ সময় আছে।"
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকরা তাওয়ানার এমআরআই স্ক্যান করানোর আগে তার গর্ভাবস্থা পরীক্ষা করতে বলেছিলেন।
তাওয়ানা চিকিৎসকদের এই উদ্বেগকে রীতিমতো হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন - তার বাহুতে একটি গর্ভ-নিরোধক ইমপ্ল্যান্ট বসানো ছিল এবং তার শরীরে গর্ভবতী হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।
যখন গর্ভাবস্থা পরীক্ষার ফল নেতিবাচক আসে তখন তাওয়ানা আরও বেশি নিশ্চিত হন যে তিনি সঠিক ছিলেন।
কিন্তু একজন নার্স তাকে আলট্রাসাউন্ড করানোর জন্য চিকিৎসককে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, কারণ তখনও তার সন্দেহ ছিল যে তাওয়ানা গর্ভবতী হতে পারেন।
রিভারের বাবা ইমানুয়েল বলেন, যখন তাওয়ানা তাকে জানান যে তিনি সন্তান জন্ম দিতে চলেছেন, তখন তিনি তাওয়ানার কথা বিশ্বাস করতে চাননি।
"এই কথার কোনও মানেই ছিল না," তিনি বলেন। "এটা খুব অলৌকিক মনে হয়েছিল।"
সাধারণত গর্ভবতী হলে মায়ের মধ্যে বমি হওয়া বা পেট স্ফীত হওয়ার মতো স্বাভাবিক যেসব লক্ষণ দেখা দেয়, সেসব লক্ষণ ছাড়াই বাচ্চা হওয়াকে ক্রিপটিক প্রেগনেন্সি বা রহস্যময় গর্ভাবস্থা বলা হয়।
এমন ঘটনা বিরল, অর্থাৎ সচরাচর ঘটে না। তবে তাওয়ানা বলেছেন যে তাকে চিকিৎসকরা বলেছিলেন যে "কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি বেশ সাধারণ বিষয়"।
"[আমাকে বলা হয়েছিল এটি মূলত আমাদের নিতম্ব ও হাড়ের গঠনের কারণে, শিশুটি বাইরের দিকে বৃদ্ধি পায় না, এটি ভিতরের দিকে বৃদ্ধি পায় এবং আমাদের ব্রিচ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে," তাওয়ানা বলেন।
ব্রিচ হলো মায়ের গর্ভে শিশুর বিশেষ ধরণের অবস্থান। যেখানে শিশুর নিতম্ব, পাঁজর বা পা মায়ের জরায়ুর কাছাকাছি থাকে এবং জন্মের সময় এই অঙ্গগুলোই প্রথমে বেরিয়ে আসে।
"সুতরাং যখন আমার সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় হয়, তখন আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল যে সে যদি উল্টো হয়ে যায়।"
যদিও ক্রিপটিক গর্ভাবস্থার তথ্য তেমন একটা পাওয়া যায় না, এ বিষয়ে লন্ডন সাউথ ব্যাঙ্ক ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধ্যাপক অ্যালিসন লিরি বলেছেন, এ নিয়ে যত তথ্য আছে তা থেকে ধারণা করা যায় জাতিগত সংখ্যালঘু নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন যত্নে বৈষম্য রয়েছে৷
তিনি বলেন, "অনেক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে নারীরা, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের গর্ভাবস্থা এবং প্রসবের ক্ষেত্রে ফলাফল খারাপ হয়।"
তিনি মনে করেন যে, ক্রিপটিক গর্ভধারণের মতো বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
"এ কারণেই বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ যদিও হাতে গোনা কিছু মানুষ এর শিকার হন। আপনি যদি ভালো মাতৃত্বকালীন যত্ন এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত যত্ন না পান তবে আপনার গর্ভাবস্থার ফল খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে।"
তাওয়ানা যখন জানতে পারেন তিনি গর্ভবতী, তার ঠিক চার সপ্তাহ চার দিন পর তিনি তার সন্তান রিভারের জন্ম দেন। তার আগে শিশুর জন্ম পূর্ববর্তী অনুষ্ঠান বা বেবি শাওয়ারও সম্পন্ন করা হয়।
তিনি বলেছেন যে তিনি এরপর প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতার সাথে লড়াই করেছেন এবং এত অল্প সময়ের নোটিশে একজন অল্পবয়সী মা হওয়ায় সন্তান পালনের পরামর্শ পেতে তিনি টিকটকের নানা কন্টেন্ট খুঁজতেন।
বিশেষ করে তাদেরকে যাদের পরিস্থিতি ঠিক তার মতো।
তাওয়ানা বলেছেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একজন নারী ছাড়া আর কাউকে পাননি যিনি একই রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন।
"আমি সত্যিই অনেক গভীর বিষণ্ণতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম কারণ আমার মনে হচ্ছিল আমাকে পরামর্শ দেওয়ার কেউ নেই।
"কেউ এই বিষয়ে কথা বলছে না। বিষয়টা কী, কেমন কেউই জানে না। তারপর আমি একটি আমেরিকান মেয়ের ভিডিও দেখি। যার ভিডিওতে একশ'র মতো ভিউ ছিল। আক্ষরিক অর্থে তিনিই একমাত্র মানুষ ছিলেন যিনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন।"
তাওয়ানা পরে তার এমন অনন্য অভিজ্ঞতা অনলাইনে শেয়ার করার সিদ্ধান্ত নেন। তার এমনই এক ভিডিওতে যা প্রায় চার লাখের বেশি লাইক পড়ে।
তিনি একটি পডকাস্টও শুরু করেন এবং অন্য মায়েদের সাথে কথা বলতে শুরু করেন।
তাওয়ানা বলেছেন যে, তিনি তার গল্পটি শেয়ার করেছেন এবং আশা করেছেন যে এটি অল্পবয়সী মায়েদের সাহায্য যোগাতে পারে, যারা শেষ মুহূর্তে তার মতো গর্ভবতী হওয়ার কথা জেনেছেন।
তিনি মনে করেন, তিনি যথেষ্ট ভাগ্যবান যে তিনি তার মায়ের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন, কিন্তু তিনি এটাও জানেন যে অন্যরা এতটা ভাগ্যবান নাও হতে পারে।
আদর্শের দিক থেকে, তিনি একটি দাতব্য সংস্থা স্থাপন করতে চান৷
"কোনও সাহায্য নেই, তাই যদি আপনার সাথে এমন কিছু ঘটে থাকে, তবে আপনি কীভাবে মোকাবেলা করছেন?"
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যমতে, ক্রিপটিক গর্ভাবস্থার ঝুঁকি কয়েকটি কারণে থাকতে পারে।
• সম্প্রতি সন্তান জন্মদান: সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে, একজন মায়ের মাসিক ফিরে আসতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে এবং তিনি যদি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান তাহলে তার ডিম্বস্ফোটন নাও হতে পারে।এটি মিথ্যা ধারণার জন্ম দিতে পারে যে তিনি গর্ভবতী হবেন না। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় কখন মায়ের ডিম্বস্ফোটন হবে এবং তিনি কবে আবার উর্বর হয়ে উঠবেন তা আগে থেকে বলা কঠিন।
• পিসিওস (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম): পিসিওস-এ আক্রান্তদের পিরিয়ড হয় অনিয়মিত। যেহেতু পিরিয়ড না হওয়া তাদের জন্য স্বাভাবিক, তাই তারা তাদের পিরিয়ড মিস করলে বুঝতে পারেন না যে তারা গর্ভবতী।
• জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার: যারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন তারা ভুল করে ভাবতে পারেন যে তারা গর্ভাবস্থা থেকে সুরক্ষিত। এমনকি সঠিকভাবে ব্যবহার করলেও ব্যর্থতার সম্ভাবনা থাকে।
• পেরিমেনোপজ: যাদের বয়স ৮০ এর কোঠায় তারা ভাবতে পারেন যে সন্তান ধারণ করার ক্ষেত্রে তাদের বয়স অনেক বেড়ে গিয়েছে। এজন্য তারা যদি গর্ভবতী হয়ে যান, অনেক সময় তারা তাদের গর্ভাবস্থার লক্ষণগুলোকে মেনোপজের লক্ষণ ভেবে ভুল করেন।
• কখনও গর্ভবতী হননি: আপনি যদি আগে কখনও গর্ভবতী না হয়ে থাকেন, তাহলে গর্ভবতী হলে কেমন লাগে তা জানার সম্ভাবনা কম। এ কারণে গর্ভাবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য অজানা থাকতে পারে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যমতে, আপনি যে গর্ভবতী তা না জানাই ক্রিপটিক গর্ভাবস্থার নানা জটিলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী। এর মধ্যে কয়েকটি জটিলতা হলো:
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যমতে, বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে ক্রিপটিক গর্ভাবস্থা থেকে জন্ম নেওয়া শিশু প্রিম্যাচ্যুর বা অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
যার কারণে শিশুর বৃদ্ধি দুর্বল হয়। শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিও থাকে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution