
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ৫ আগস্টের কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে ঢাকার সাভারে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন নীলফামারীর সৈয়দপুরের সাজ্জাদ হোসেন (৩৪) । সে শহীদ হওয়ার আজ প্রায় এক বছর হতে চলেছে। কিন্তু এখন তাঁর বাবা-মা পরিবারের বড় ছেলের শেষ কথা ও স্মৃতিগুলো ভুলতে পারেননি। এখনও তাঁর বাবা-মা ছেলে সেই দিনের কথাগুলো আর স্মৃতি মনে করে অঝোঁরে ফেলেন দুই চোখের পানি ।
গত বৃহস্পতিবার সাজ্জাদ হোসেনের মা সাহিদা বেগমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিনিধি। এ সময় তিনি ছেলের (সাজ্জাদ) ৫ আগষ্টের শেষ কথা ও স্মৃতিগুলো তুলে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। শহিদ সাজ্জাদ হোসেনে মা সাহিদা বেগম বলেন, ৫ আগস্ট সকালে বাইরে যাবে ছেলে শহিদ সাজ্জাদ হোসেন। তাই আমার কাছে সে (সাজ্জাদ) সকালের নাস্তা চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি বাসায় তৈরি কোন রকম নাস্তা না থাকায় দিতে পারিনি। তবে সকাল সকাল ছেলের জন্য তড়িঘড়ি করে ভাত রান্না করি। পরে তা নিজ হাতে পরিবেশন করে খাওয়াই। তবে সেদিন সে তেমন একটা ভাত খেতে পারেনি। কিন্তু ছোট বোনকে ডেকে পাশে বসিয়ে নিজ হাতে খাইয়েছে। এরপর একশত টাকার একটি নোট আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে মা এটি দিয়ে বিকেলের নাস্তা এনে খেয়ে। আমার হয়তো ফিরতে অনেক দেরি হবে। শহিদ সাজ্জাদ হোসেনের মুখে শোনা এটিই শেষ কথা তাঁর মায়ের। ছেলে সেদিনের কথাগুলো বলতে বলতে বৃদ্ধা মা সাহিদা বেগমের দুই চোখ বেয়ে অঝোঁরে ঝরছিল জল। এরপর অনেক সময় বাকরুদ্ধ থাকেন তিনি। পরে কেঁদে কেঁদে বলেন, পরিবারের বড় ছেলে ছিল আমার সাজ্জাদ। আমাদের পরিবারের এক মাত্র শক্তি ছিল সে। ছিল বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। শহিদ সাজ্জাদ হোসেনের মা সাহিদা বেগম বলেন, তাকে হারিয়ে আমরা এখন অনেকটাই দিশেহারা। জুলাই আন্দোলনে শহিদ সাজ্জাদ হোসেনকে ভুলতে পারছেন না তাঁর পরিবার। বাবা-মা তাদের স্মৃতি হাতড়িয়ে ফিরছেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহিদ সাজ্জাদ হোসেন ছিলেন নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভার পশ্চিম পাটোয়ারীপাড়া মহল্লাার আলমগীর হোসেন ও সাহিদা বেগম দম্পতির ছেলে। মা-বাবা আর দুই বোনকে নিয়ে সাভার ডেইরি ফার্ম এলাকার দক্ষিণ কালমা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তারা এক ভাই এবং তিন বোন। শহিদ সাজ্জাদ হোসেন ছিলেন সবার বড়। ঢাকার সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিল সাজ্জাদ। লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করতেন একটি পোশাক কারখানায়। বাবা আলমগীর হোসেন সাভারের একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। কিন্তু যে যৎসামান্য হাদিয়া পেতেন তা দিয়ে নিজের পকেট খরচই ঠিকভাবে চলতো না। ফলে পুরো পরিবারটিকে পরিচালনা করতে হতো শহিদ সাজ্জাদকে। গত বছরের ৫ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অগ্রভাগে ছিলেন সাজ্জাদ। এরপর বেলা ১১টার দিকে ঢাকার সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৬ আগস্ট বেলা ১২টায় তার মৃত্যু হয়। পরে ৭ আগস্ট তাকে সৈয়দপুরে এনে দাফন করা হয় শহরের হাতিখানা কবরস্থানে।
শহিদ সাজ্জাদ হোসেনের বাবা মাওলানা মো. আলমগীর হোসেন জানান, আমার নিজস্ব কোন ভিটেমাটি পর্যন্ত নেই। বর্তমানে সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের চৌমুহনী এলাকায় বিমানবন্দরের রানওয়ের পশ্চিম পাশে দুই হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করছি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এখনো তাদের বিয়ের দেনা-পাওনা মেটাতে পারিনি। সংসারের কোন জিনিসপত্রও দিতে পারেনি। এখন ছোট্ট মেয়েটি বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের লক্ষণপুর স্কুল ও কলেজে ১০ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। আমার এক মাত্র ছেলে শহিদ সাজ্জাদ হোসেনের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে ভাল চাকরি করবে। নিজে জমি কিনে একটি বাড়ি, মাদ্রাসা ও মসজিদ তৈরি করার। জীবদ্দশায় তাঁর সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলো। তাই তিনি ছেলে হত্যার বিচার দেখে মরতে চান।
এদিকে, শহিদ সাজ্জাদ হোসেনের পরিবারকে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ টাকা মোহরানা বাবদ শহিদ সাজ্জাদের স্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। গত ১০ জুলাই ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের মধ্যে মা-বাবাকে সাড়ে ৭ লাখ টাকার এবং তাঁর স্ত্রীকে আড়াই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা ও এবং স্থানীয় বিএনপি থেকে ১০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও সৈয়দপুর সেনানানিবাসে অবস্থিত বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সাজ্জাদের বাবা আলগেীর হোসেনকে পৌরসভার ওয়াক্তিয়া মসজিদের ঈমামের চাকরির ব্যবস্থা করে দেন সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মো. নূর-ই আলম সিদ্দিকী।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution