
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়। এ অবস্থায় দেশের প্রায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ মনে করেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং তার ছেলে তারেক রহমানের এই মুহূর্তে মায়ের পাশে থাকা জরুরি। কিন্তু দেশে ফেরার বিষয়ে সম্প্রতি নিজেই সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন- দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়! তখন থেকে মিডিয়াপাড়া সরব, তাহলে কি তারেক রহমান কে কোন একটা শক্তি দেশে ফিরতে দিচ্ছে না ?
সে কারণেই বিএনপি’র রাজনীতি আজ যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, তার অন্যতম কেন্দ্রে রয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে প্রত্যাবর্তন-অপ্রত্যাবর্তনের অন্তহীন বিতর্ক। ‘তারেক জিয়া দেশে ফিরবে, তারেক জিয়া আসবে না!’- এই দুটি বাক্যের টানাপড়েন শুধু বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেই প্রভাবিত করছে না; বরং দেশের বর্তমান সামগ্রিক রাজনৈতিক গতিপথকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন- তারেক রহমান কি আসলেই দেশে আসবেন ? আর যদি না আসেন, তাহলে বিএনপি নির্বাচনকালীন সময় এবং নির্বাচন পরবর্তী কোন পথে এগোবে? এই অনিশ্চয়তা দলটির অভ্যন্তরে যেমন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি জাতীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এর প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
২০০৮ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তথাকথিত মুচলেকা দিয়ে তারেক রহমান দেশত্যাগ করেন। দেশে না থাকলেও সেই সময় থেকেই তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি ভিন্নধারার ভাবনার নেতা হিসেবে বিবেচিত হন। বিদেশে অবস্থান করলেও মার্জিত বাচনভঙ্গি, দলের কৌশলগত সিদ্ধান্ত, আন্দোলন-সংগঠনের রূপরেখা এবং যুগোপযোগী রাজনৈতিক যোগাযোগে তারেক রহমানের ভূমিকা ক্রমেই বেড়ে ওঠে। বিশেষ করে গত স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া গণ-অভ্যুত্থানে দেশে না থেকেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
তবে বাস্তবতা হলো- তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তাজনিত বহু জটিলতা রয়েছে। দেশে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলা, আদালতের রায় এবং রাজনৈতিক চাপ দলটিকে বারবার এমন অবস্থায় ফেলছে, যেখানে প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়- বরং একটি বহুস্তরের জটিল সমীকরণের অংশ।
রাজনীতির কঠিন সময়েও তৃণমূল যেভাবে তারেক রহমানের প্রতি আস্থা অব্যাহত রেখেছেন, তা বিএনপির রাজনীতির প্রধান শক্তি। তৃণমূল মনে করেন, দেশীয় রাজনীতিতে একটি দৃঢ় নেতৃত্বের প্রয়োজন, এবং এই শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম একমাত্র তারেক রহমান। এ বিষয়ে তাদের যুক্তি- তারেক রহমান দেশে এলে নির্বাচনী মাঠে দল বাড়তি সুবিধা পাবে এবং দল অতীতের চেয়ে শক্তিশালী হবে, বিএনপি সংগঠিত হবে এবং নেতৃত্বের দ্বিধা দূর হবে, ভোটের মাঠে নতুন ভারসাম্য তৈরি হবে, দলটি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। এই প্রত্যাশা অনেকটা আবেগনির্ভর হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তৃণমূলের আবেগ, কর্মীদের মনোবল, মাঠের আন্দোলন শক্তি- সবকিছুতেই তারেক রহমান একটি প্রেরণার নাম।
তিনি দেশে ‘আসবেন না’ এটাও রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা, আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দেশে ফেরা ঝুঁকিপূর্ণ। এর পক্ষে কিছু নিদৃষ্ট কারণ বিবেচনায় রাখছেন। কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- তথাকথিত মূচলেকার বিষয় অজানা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কৌশলগত চাপ, আন্তর্জাতিক মৈত্রীসংশ্লিষ্ট বিবেচনা, বিএনপির নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা।
এ অবস্থায় অনেকেই মনে করেন, তারেক রহমানকে দূর থেকেই দল পরিচালনা করা বিএনপির কৌশলগত সুবিধা। বাস্তবতাও বলে, বিদেশে থাকলে তিনি দলের জন্য রাজনৈতিকভাবে ‘উপস্থিত থাকলেও অপ্রাপ্য’, যা এক ধরনের সুরক্ষা দেয়।
নেতৃত্ব বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক স্থবিরতায় এই দোটানার ফল হলো নেতৃত্বগত বিভ্রান্তি। বিএনপির অনেক সিদ্ধান্তে দ্বিধা তৈরি হয়, কোন দিক থেকে নির্দেশ আসছে, কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কোন পথে হাঁটবেন- তা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে যেসব চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে- আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়, সাংগঠনিক সংহতি দুর্বল হয়, কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত বাড়ে, দলীয় কর্মীদের হতাশা জন্মায়। সব মিলিয়ে বিএনপি একটি নেতৃত্বনির্ভর দল হওয়ায় তারেক রহমানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা পুরো দলকেই এক ধরনের অচলায়তনে বন্দি করে রাখছে।
সরকার তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে সবসময় রাজনৈতিক চাপের জায়গায় রেখেছে। যে কোনো অস্থিরতা, আন্দোলন কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনায় বিষয়টি সামনে আসে। মামলার রায়, রাজনৈতিক মন্তব্য, কঠোর অবস্থান- এসবই তারেক রহমানের দেশে ফেরা আরও কঠিন করে তোলে।
অন্যদিকে বিএনপি তার অনুপস্থিতিতে শক্তিশালী দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক সিনিয়র নেতা বয়স, স্বাস্থ্য বা রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতায় ততটা সক্রিয় নেই। ফলে দলটি দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষায়- তারেক রহমান আসবেন, তারপর সবকিছু নতুনভাবে শুরু হবে। নেতৃত্বের এমন অনিশ্চয়তা যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধীদল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিএনপির এই দোটানা দেশের রাজনৈতিক মেরূকরণ বাড়াচ্ছে, গণতন্ত্রের কাঠামোতে ভারসাম্যহীনতা আনছে, নির্বাচনী রাজনীতিকে দুর্বল করছে, জনগণের আস্থায় ধস নামাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সক্ষম বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র বিকাশ পেতে পারে না। সে কারণে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন-অপ্রত্যাবর্তনের দ্বন্দ্ব শুধু বিএনপির নয়- পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
তারেক রহমান ফিরবেন কি ফিরবেন না- এটি নিয়ে আবেগ নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলীয় ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনটি দিক এখানে গুরুত্বপূর্ণ- ক. বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলা: তারেক রহমান দলের শীর্ষে থাকবেন এতে বিতর্ক নেই। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের দায়িত্ব নিতে সক্ষম দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি না হলে দল ক্রমেই দুর্বল হবে। খ. কৌশলগত সংহতি : দলটির আন্দোলন, নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি নিয়ে দল কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। গ. বাস্তব রাজনীতি মেনে নেওয়া তারেক রহমানের দেশে ফেরা আবেগ দিয়ে নয়, আইনি-রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজন হলে সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়ে পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাকে ঘিরে প্রত্যাবর্তন-অপ্রত্যাবর্তনের বিতর্ক যত দীর্ঘায়িত হবে, দেশের রাজনীতিতে তত অস্থিরতা বাড়বে। বিএনপির জন্য প্রয়োজন- অনিশ্চয়তার জালে আটকে না থেকে বাস্তব অবস্থার ওপর ভিত্তি করে দলকে সংগঠিত করা, শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। তারেক রহমান ফিরবেন কি ফিরবেন না- এ প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। কিন্তু দেশ এবং রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থে দলটিকে এখনই সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতির পথে হাঁটতে হবে। কারণ দোটানায় থাকা কোনো দলই দীর্ঘসময় জনআস্থা ধরে রাখতে পারে না, আর এভাবে দোদুল্যমান রাজনীতি দেশের গণতন্ত্রের জন্যও সুখকর নয়।
লেখক- বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সকালের বাণী।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution