
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্নীতির ঘটনায় যাদের নাম বারবার আলোচিত হচ্ছে, যাদের ঘিরে রয়েছে শক্তিশালী প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়—তারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ আইনগত তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল কিংবা প্রান্তিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। এই বাস্তবতার সাম্প্রতিক ও আলোচিত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে গত ১৭ ডিসেম্বর রাতে আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু খায়েরের গ্রেফতারের ঘটনা।
পুলিশ তাকে একটি পুরোনো রাজনৈতিক মামলায় আওয়ামী লীগ পরিচয়ে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। তবে ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবু খায়ের আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে ছিলেন না, নেই কোনো সাংগঠনিক পদ বা দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ। এমনকি অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে—তিনি ৩ নম্বর আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের কৃষকলীগের সদস্য ছিলেন এ দাবি স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী “ভিত্তিহীন ও অসত্য”।
এ অবস্থায় তাকে ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ পরিচয়ে গ্রেফতার করায় স্থানীয় রাজনীতিতে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যে মামলায় আবু খায়েরকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, তার সূত্রপাত ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওই সময় খানসামা থানায় মারামারি ও ভাঙচুরের অভিযোগে যুবদল নেতা রাশিদুজ্জামান স্মৃতি একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় একাধিক অজ্ঞাতনামা আসামির নাম উল্লেখ ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই অজ্ঞাতনামা তালিকায় পরবর্তী সময়ে আবু খায়েরের নাম যুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে যিনি কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রের অংশ ছিলেন না কিংবা সক্রিয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে ছিলেন না, তিনি কীভাবে হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে এলেন?
স্থানীয়দের মতে, এটি কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং খানসামায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি প্রবণতার অংশ যেখানে দৃশ্যমান ‘বিচার’ দেখাতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল বা প্রভাবহীন ব্যক্তিদের সামনে আনা হয়, আর প্রকৃত অভিযোগভুক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আড়ালেই থেকে যান। একই মামলায় এর আগেও ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের শহিদুল ইসলাম নামে একজন ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনিও একজন নিরীহ সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত এবং তার কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার নজির নেই।
তাকেও অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে আওয়ামী লীগ পরিচয়ে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছিলযা সে সময়ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবু খায়েরের বড়ো ভাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ছোট ভাই ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে আবু খায়ের নিজে কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, তিনি জামায়াতে ইসলামির কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ইউনিয়ন সভাপতি মশিউর রহমান মুজাহিদ বলেন, “আবু খায়ের কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি পুরোনো মামলায় জড়ানো হয়েছে। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।” স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম, আনারুল, মাইজার ও জাহিদসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, “খায়ের ভাই কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। অথচ যাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।” এ বিষয়ে জানতে চাইলে খানসামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল বাছেত সরদার বলেন, “আবু খায়েরকে যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, সেটি একটি পুরোনো রাজনৈতিক সহিংসতার মামলা। মামলাটি ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দায়ের করা হয়। মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় তাকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।”
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution