
একসময় বাঙালি বিয়ে মানেই ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, কমিউনিটি সেন্টার, শত শত অতিথি আর কয়েক দিনব্যাপী আয়োজন। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ভ্রমণপ্রিয় মানসিকতা আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব সব মিলিয়ে বিয়ের ধারণাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের নাম ডেস্টিনেশন ওয়েডিং। আজ এটি আর শুধু অভিজাতদের বিলাসিতা নয়, বরং মধ্যবিত্ত তরুণ তরুণীদের কাছেও হয়ে উঠছে কাঙ্ক্ষিত এক অভিজ্ঞতা।
ডেস্টিনেশন ওয়েডিং কী? ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বলতে বোঝায় নিজের শহর বা বসবাসের জায়গা ছেড়ে অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থান বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপূর্ণ এলাকায় সীমিত অতিথি নিয়ে বিয়ের আয়োজন করা। সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, রিসোর্ট, হেরিটেজ প্রপার্টি বা বিদেশের কোনো শহর সবই হতে পারে এই ধরনের বিয়ের গন্তব্য।
এই ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের উৎপত্তি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোতে। ইউরোপ ও আমেরিকায় ১৯৮০-৯০-এর দশকে ছোট পরিসরে বিয়ে করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। সেই সময় থেকেই সমুদ্র সৈকত বা রিসোর্টে বিয়ের ধারণা জনপ্রিয় হয়। পরে বলিউড তারকাদের হাত ধরে ভারতে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। রাজস্থান, গোয়া, উদয়পুর কিংবা বিদেশে ইতালি, থাইল্যান্ড এই সব জায়গায় তারকাদের বিয়ের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে এই ধারণা তুলনামূলক নতুন। ২০১০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এটি পরিচিত হতে শুরু করে। শুরুতে ধনী ব্যবসায়ী পরিবার বা শোবিজ অঙ্গনের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই আয়োজন। তবে গত পাঁচ-সাত বছরে মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজের মধ্যেও ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের চাহিদা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। কক্সবাজার, সাজেক, বান্দরবান, সিলেট কিংবা দেশের বিভিন্ন রিসোর্ট এখন বিয়ের জনপ্রিয় গন্তব্য।
ডেস্টিনেশন ওয়েডিং জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, সীমিত অতিথি। প্রচলিত বিয়েতে আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত-অপরিচিত মিলিয়ে অতিথির সংখ্যা কয়েক শ’ ছাড়িয়ে যায়। ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ে সাধারণত কাছের মানুষদের নিয়েই আয়োজন করা হয়, ফলে খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে বিয়ে ও ভ্রমণ। বিয়ে উপলক্ষে বর–কনে ও অতিথিরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান। এতে আয়োজনের ক্লান্তি কমে, আনন্দ বাড়ে। তৃতীয়ত, ভিন্নতা ও ব্যক্তিগত ছোঁয়া। পাহাড়, সমুদ্র বা ঐতিহাসিক প্রাসাদের মাঝে বিয়ে এই অভিজ্ঞতা প্রচলিত কমিউনিটি সেন্টারের বিয়ের চেয়ে আলাদা এবং স্মরণীয়।
ডেস্টিনেশন ওয়েডিং জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে বিয়ের ভিডিও ও ছবির ঝলক মানুষকে আকৃষ্ট করছে। ‘পারফেক্ট ওয়েডিং ফটো’ বা ‘ড্রিম ওয়েডিং’ এই ধারণাগুলো তরুণদের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে।
অনেকে মনে করেন ডেস্টিনেশন ওয়েডিং মানেই আকাশছোঁয়া খরচ। বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। অতিথি সংখ্যা কম হওয়ায় খাবার, হল ভাড়া ও অন্যান্য খরচ অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে যাতায়াত, থাকা ও সাজসজ্জার খরচ যোগ হওয়ায় বাজেট পরিকল্পনা না করলে ব্যয় বাড়তে পারে। বাংলাদেশে একটি মাঝারি মানের ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের খরচ ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব বলে জানান ইভেন্ট প্ল্যানাররা।

তবে এতসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী দিনে বাংলাদেশে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং আরও জনপ্রিয় হবে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন, রিসোর্ট ও হোটেলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তরুণদের জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারা আরও বিস্তৃত হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution