
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছিট আলোকডিহি এলাকায় বসবাস করছেন মো. রমজান আলী (৬৭)। জীবন কাটিয়েছেন সংগ্রাম আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। এক সময় তিনি ছিলেন আনসার বাহিনীর সদস্য দেশের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু আজ, শেষ বয়সে এসে তার নামে নেই এক টুকরো ভিটেমাটি, নেই মাথা গোঁজার নিরাপদ ছাদ। ভিটেমাটি না থাকায় গত ১৬ বছর ধরে তিনি ও তার স্ত্রী সাহিদা বেগম পার্শ্ববর্তী মৃত জয়নাল আবেদীনের খামারে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন।
খামারের ভেতরে থাকা জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা ঘরই তাদের একমাত্র ঠিকানা। সরেজমিনে দেখাগেছে খামারের ভেতরে কাঠের মাচার ওপর বসে আছেন বৃদ্ধ দম্পতি। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে দীর্ঘ জীবনের না বলা কষ্ট। পেছনের ছেঁড়া নেট ও ভাঙা দেয়াল যেন তাদের অনিরাপদ জীবনের নীরব সাক্ষী। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে, শীতের রাতে কনকনে ঠান্ডা সরাসরি শরীরে লাগে। নেই কোনো নিরাপদ দরজা-জানালা, নেই ন্যূনতম বসবাসযোগ্য পরিবেশ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও রমজান আলী খামারের ভেতরে গরু, মুরগি ও অন্যান্য কাজ সামলাচ্ছেন। হাতে কোদাল, সামনে গোয়ালঘর এই কঠোর পরিশ্রমই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
অথচ এই শ্রমের বিনিময়ে মাস শেষে মেলে মাত্র এক হাজার টাকা, যা দিয়ে ন্যূনতম জীবনধারণও কঠিন। রমজান আলীর বড়ো ছেলে শাহাজাহান আলী জানান, তিনি প্রায় চার বছর ধরে পাকেরহাট বাজারের ফুটপাতে বাদাম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। প্রতিদিন বিক্রি হয় আনুমানিক ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। খরচ বাদে হাতে থাকে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করে ছয় সদস্যের সংসার খাবার, ওষুধ এবং নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা। ফলে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বৃদ্ধ দম্পতির দাবি, তারা কোনো দান বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা চান না। শেষ বয়সে তারা চাইছেন শুধু একটি নিরাপদ ঘর, যেখানে অন্তত নিশ্চিন্তে রাতের ঘুম কাটানো সম্ভব হবে। রমজান আলী বলেন, “১৬ বছর ধরে এই খামারে আশ্রয় নিয়েছি। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে, শীতে শরীর কাঁপে। শেষ বয়সে আর কিছু চাই না শুধু ঘুমানোর মতো একটি ছাদ চাই।”
চোখে অশ্রু নিয়ে তার স্ত্রী সাহিদা বেগম বলেন, “আমার নিজের কোনো জায়গা জমি নেই। মানুষের খামারে থাকি। কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পাই না। চেয়ারম্যান-মেম্বার আমাদের দেখে না। এই শেষ বয়সে আমরা একটু ভালোভাবে থাকতে চাই।” খামারের মালিক তাহেরা আজিজ বলেন, “তারা খুব অসহায় পরিবার। থাকার মতো জমি না থাকায় মানবিক কারণে আমরা তাদের আমাদের খামারে থাকতে দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ ধরনের পরিবার সমাজে থাকা উচিত নয়।
সামাজিক নিরাপত্তা ও আবাসন কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার। মানুষ যেন নিরাপদে ঘুমাতে পারে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।” স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, একজন সাবেক আনসার সদস্যের এমন মানবেতর জীবনযাপন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বড়ো ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা অবিলম্বে উদ্যোগ নিয়ে এই পরিবারকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার ব্যবস্থা করবেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution