
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় একই পরিবারের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে জমি দখলের চেষ্টা, ফসল নষ্ট, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকির একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পৃথক তিনটি ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়ায় এলাকায় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। থানা সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৪নং খামারপাড়া ইউনিয়নের কায়েমপুর (শাহপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা মো. ফজলে রহমান এবং তার দুই ছেলে মাহাবুর রহমান ও মাসুদ রহমানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, পৈতৃক সম্পত্তির মালিক প্রফেসর ডা. মো. আফজাল হোসেন (বর্তমানে ঢাকার একটি মেডিকেল কলেজে কর্মরত) এবং স্থানীয় বাসিন্দা মো: আবু হুসাইন সিদ্দিকীর সঙ্গে অভিযুক্তদের দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এ বিরোধের জেরে গভীর রাতে প্রফেসর আফজাল হোসেনের গ্রামের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। এ সময় বাড়ির পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দিনে এসে বাড়ির লিচু ও আমগাছের চারপাশের ঘেরা ভেঙে ফেলা হয় এবং একটি শিমুল গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়, যার ফলে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাড়ির কেয়ারটেকার বাধা দিতে গেলে তাকেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় অভিযুক্তরা বাড়ির সামনে থাকা সরকারি রাস্তা বাঁশ ও লোহার বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেয় বলেও অভিযোগ ওঠে। এতে ভুক্তভোগীরা বাড়িতে প্রবেশ করতে গেলে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে জোয়ার গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক জানান, তিনি কায়েমপুর মৌজার ২৬ শতক জমি বর্গা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করে আসছেন। জমির মালিক প্রফেসর ডা. মো. আফজাল হোসেন ও শিক্ষক মো. আবু হুসাইন সিদ্দিকী। তিনি ওই জমিতে রসুন চাষ করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ মার্চ ২০২৬ রাতে তার রসুন ক্ষেতে বিষ প্রয়োগ করে প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়। পরদিন সকালে জমিতে গিয়ে গাছের অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে তিনি বিষয়টি স্থানীয়দের অবহিত করেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, ঘটনার রাতে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী অভিযুক্তদের ওষুধের জারকিন হাতে সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করতে দেখেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্তরা উল্টো গালিগালাজ ও হুমকি প্রদান করেন বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী। সর্বশেষ অভিযোগে একই এলাকার বাসিন্দা আবু হুসাইন সিদ্দিকী জানান, বসতবাড়ির সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। তিনি পৈতৃক জমিতে শরিষা চাষ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুপুরে অভিযুক্তরা জোরপূর্বক তার জমিতে প্রবেশ করে শরিষা কাটতে শুরু করে। বাধা দিলে তাকে গালিগালাজ, মারধরের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এতে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
একই পরিবারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে একাধিক অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এলাকাবাসীর মতে, দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মাধ্যমে নতুন করে সহিংস রূপ নিচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে জমি দখলের উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে এবং তারা বর্তমানে নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছেন। তারা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী প্রফেসর ডা. মো. আফজাল হোসেন বলেন,“ঘটনাগুলোর পেছনে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে আমার দৃঢ় ধারণা। বিশেষ করে আলতাফ হোসেনের ছেলে আকতারুলকে আমি এসব ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী, পরামর্শদাতা ও প্রভাবক হিসেবে মনে করি। তার প্ররোচনা ও সাহসেই এসব কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত ফজলে রহমান ও মাহাবুর রহমান বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমাদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমরা কোনোভাবেই এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই; বরং আমাদেরকেই ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।” এ বিষয়ে খানসামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল বাছেত সর্দার বলেন, “একই পক্ষের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। প্রতিটি অভিযোগ পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে—কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে। কেউ জোরপূর্বক দখল, ভয়ভীতি বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution