
ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশের জ¦ালানি তেলের মজুত নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জ¦ালানি তেলের সংকট না থাকার দাবি করা হলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন, গ্রাহক-বিক্রেতার বিবাদ ও সংঘর্ষের অভিযোগ-সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। রংপুরে এমন অবস্থার পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জেনারেটরে জ¦ালানির চাহিদা পাম্পগুলোতে বাড়তি চাপের সৃষ্টি করেছে।
সোমবার বেলা ১২টা থেকে রংপুরের গঙ্গাচড়ার শিহাব ফিলিং স্টেশনে জ¦ালানি তেল বিতরণ করা হবে-এমন খবরে সকাল থেকে পেট্রোল পাওয়ার আশায় মোটরসাইকেল নিয়ে ভিড় করেন লোকজন। গঙ্গাচড়া ডিগ্রি কলেজ থেকে পাম্প পর্যন্ত আধা কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করেন তারা।
মাত্র ২৫০০ লিটার পেট্রোল দুই ঘন্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত লাইনে থাকা অনেককে তেল না পেয়ে ফেরত যেতে হয়। জ¦ালানি সংকটের এই সময়ে চলছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। মোটরসাইকেলে পিছনে অনেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জেনারেটর তুলে নিয়ে আসেন অনেকে। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি তাদের জেনারেটরেও পেট্রোল সরবরাহ করতে হয়েছে। পাম্পে জেনারেটর নিয়ে আসা গঙ্গাচড়ার সানাবিল মার্কেটের ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদ ও রুহুল আমিন জানান, এমনিতে সন্ধ্যা ৬টার পর মার্কেট-শপিংমল বন্ধ করায় ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। তার ওপর কয়েকদিন ধরে দফায় দফায় বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। জ¦ালানি সংকটের কারণে জেনারেটর চালিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখাও সম্ভব হচ্ছেনা।
শিহাব ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী সাহেদুজ্জামান সবুজ জানান, গত বছর মার্চ মাসে ২৭০০০ লিটার পেট্রোল সরবরাহ পেয়েছিলেন তিনি, কোনো সংকট তৈরি হয়নি। এ বছর মার্চে একসঙ্গে না হলেও পেয়েছেন মোট ২৮০০০ লিটার। কিন্তু তিনদিনের পেট্রোল তিন ঘন্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। সোমবার অন্তত ৫০টি জেনারেটরে তেল সরবরাহ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, মোটরসাইকেল হোক কিংবা জেনারেটর হোক-সংগৃহিত তেল আনলোড করে ঘুরে ফিরে একই ব্যক্তি একাধিকবার আসায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সঠিক দিক নির্দেশনা দরকার। যোগাযোগ করা হলে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার জানান, জ¦ালানি সমস্যায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। অবৈধ মজুদ ঠেকাতে অভিযান পরিচালনাসহ জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভিন্ন কৌশলের বিষয়টি ভাবনার মধ্যে রয়েছে।
এদিকে, সারাদেশের মতো রংপুরেও জ¦ালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার প্রায় সবগুলো তেল পাম্পে ভিন্ন ভিন্ন দিনে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘলাইন ধরে তা সংগ্রহ করতে হচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। পর্যাপ্ত তেল না পেয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে তাদের মাঝে। তবে পাম্প মালিকদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ হচ্ছে না। যার কারণে এই সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্ট ও পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রংপুর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজ শহিদ শোভন বলেন, ঈদের পর থেকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক কম জ¦ালানি তেল সরবরাহ দিচ্ছে। যার কারণে তেল নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রংপুরের মেঘনা ডিপোর ইনচার্জ জাকির হোসেন পাটোয়ারী জবাব দেন, আগে পাম্পগুলো সপ্তাহে দুইবার পেট্রোল-অকটেন নিলেও বর্তমানে প্রতিদিনই পাম্প থেকে চাহিদা আসছে। ফলে সেই অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ সূত্র জানায়, সমিতির আওতায় ৮৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে গত তিনদিন ধরে পিক আওয়ারে ২০ শতাংশ হারে কম পাওয়া যাচ্ছে। সে কারণে কিছু কিছু সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
জ¦ালানি তেল সংকটকে ঘিরে জনজীবনে তৈরি হয়েছে নানামুখী সংকট। পরিনতিতে আয়-রোজগার ছেড়ে প্রয়োজনের তাগিদে লোকজন পাম্পে পাম্পে ছুটছেন অকটেন-পেট্রোলের খোঁজে। তেল অভাবে ৪০ শতাংশ মোটরসাইকেল অলস পড়ে থাকাসহ আয় কমে যাওয়ায় ক্রমেই জনগণের মাঝে বাড়ছে ক্ষোভ। যেকোনো সময় এই ক্ষোভের আগুন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঈদের কারণে দুইদিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জ¦ালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় জ¦ালানি তেলের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে আতঙ্কিত ক্রেতাদের অতিরিক্ত জ¦ালানি কেনার প্রতিযোগিতাও বড় ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
যদিও বর্তমান সময়ে পাম্পগুলোতে সীমিত তেল দেওয়ায় তার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া তেল মজুদকারীরা ধরাও পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এমন অবস্থার মধ্যে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আবারো বলেন, দেশে পর্যাপ্ত জ¦ালানি তেল মজুত আছে এবং চলতি মাসে আরও তেল আসবে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সম্ভাব্য সব উৎস থেকে জ¦ালানি সংগ্রহ করছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে তেল মজুতের তথ্য দিয়ে জ¦ালানি মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিকটন ডিজেল মজুত আছে। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিকটন ডিজেল দেশে আসবে। অকটেন মজুত আছে ১০ হাজার ৪০০ মেট্রিকটন। চলতি মাসের মধ্যে আসবে ৭১ হাজার মেট্রিকটন। আর পেট্রোল মজুত আছে ১৬ হাজার মেট্রিকটন । ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে ৩৬ হাজার মেট্রিকটন। তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, এখনি দাম বৃদ্ধি নয়, আগামী মাসে আলোচনার পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত আছে জানিয়ে জ¦ালানিমন্ত্রী বলেন, গত এক মাসে অভিযানে ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬৫ লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও সহসাই সংকট কাটার কোনো লক্ষ্মণ পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। তেলের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে সর্বত্র।
উত্তরের জেলাগুলোর ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। তেলের সন্ধানে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন ভোক্তারা। কোথাও সীমিত পরিমাণ সরবরাহ এলেও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে তা পাচ্ছেন না। অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা নোটিস ঝুলছে। কোথাও অল্প পরিমাণ সরবরাহ এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে উত্তেজনা ও বাকবিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে পাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির এক বার্তায় বলা হয়েছে ‘বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ইরান যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি তেলের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়ে গেছে। ডিপো থেকে পেট্রোলপাম্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ¦ালানি সরবরাহ করতে পারছে না। অন্যদিকে মোটরসাইকেল ও সাধারণ ভোক্তাদের ফিলিং স্টেশনে উপচে পড়া ভিড় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ ভোক্তা ও মোটরসাইকেলচালক কর্তৃক ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মারধর করা হচ্ছে। এমনকি ফিলিং স্টেশনে ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে, প্রতিনিয়ত এসব ঘটনা বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে ফিলিং স্টেশন চালু রাখতে হবে। অন্যথায় কারো আদেশের অপেক্ষায় না থেকে ফিলিং স্টেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই স্টেশন চালাতে হবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ফিলিং স্টেশনের সব কর্মচারীকে নিরাপত্তা দিতে প্রশাসনের প্রতি জোর আহ্বান জানান ফিলিং স্টেশন মালিকরা। মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ অনেকটা নতুন সংযোজন। এর বাইরে স্কুল-কলেজ ছাড়াও চাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পরোক্ষভাবে আয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে মোটরসাইকেল। অথচ তেল অভাবে সেই মোটরসাইকেল অলস পড়ে থাকা মানেই আয় কমে যাওয়া-পেটে টান পড়া। সে কারণে বাধ্য হয়ে মানুষজন কাজ বন্ধ রেখে হলেও তেলের সন্ধানে পাম্পে পাম্পে ঘুরছেন।
অন্যদিকে, জ¦ালানি সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৬টার পর মার্কেট-শপিংমল বন্ধ রাখার নিদেশনা দিয়েছে সরকার।
এতে আয় কমেছে ব্যবসায়ীদের। তার ওপর বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তার প্রমাণ মিলেছে জেনারেটরসহ তেল নিতে ফিলিং স্টেশনে ব্যবসায়ীদের ভিড়। বিষয়টি কখনোই সুখকর নয়। তেল নিয়ে ‘তেলেসমাতি’র পর বিদ্যুতের লোডশেডিং অব্যাহত থাকলে সবার পেটে টান পড়বে, শুরু হবে মহা তেলেসমাতি। বিষয়টি নিয়ে ভাবা জরুরি এবং তা এখনই।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution