প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ১:৪২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ১০:৪৩ এ.এম

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে বিদেশি প্রজাতি (বাইনুর) জাতের লাল আঙ্গুর চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলী। তাদের এই যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যেই এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। উপজেলার গংগাহাট বাজার সংলগ্ন আজোয়াটারী এলাকায় দুই বিঘা জমিতে প্রায় ১০ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন তাদের স্বপ্নের আঙ্গুর বাগান।
বর্তমানে তাদের বাগানে রয়েছে ৪৬০ টি বাইনুর জাতের আঙ্গুর গাছ। ২০২২ সালে প্রথম ধাপে ৫০টি গাছ থেকে আঙ্গুর বিক্রি করেন প্রায় ৫ মন, ২০২৩ সালে দ্বিতীয় ১০ মন, ২০২৪ সালে তৃতীয় ধাপে ১৫ মন এবং ২০২৫ সালে চতুর্থ ধাপে ২০ মন আঙ্গুর বিক্রি করেন। চলতি ২০২৬ সালে পঞ্চম ধাপে ৬০টি আঙ্গুর গাছ থেকে ৪০–৪৫ মন বিক্রির সম্ভাবনা দেখছেন এই দুই উদ্যোক্তা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উদ্যোক্তা ব্যাংক কর্মকর্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলীর বাগানে শুধু বাইনুর জাতের আঙ্গুরই নয়,-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আঙ্গুরের গাছে গাছে ঝুলছে সবুজ আঙ্গির গুলো। এছাড়াও আঙ্গুরের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক বিভিন্ন ফলজ গাছ রয়েছে। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের সেই স্বপ্নের বাগানটি দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় করছেন। অনেকেই আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছ থেকে জাতের আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করছেন।
মাগুরা জেলা থেকে আগত সহকারী শিক্ষক ও সৌখিন কৃষি উদ্যোক্তা রামপ্রসাদ বলেন, কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলীর অসাধারণ ধৈর্য ও পরিশ্রমই তাদের আজকের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। প্রায় তিন বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের আঙ্গুর চাষ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং একসময় সরেজমিনে বাগান পরিদর্শনের সুযোগ পান।
তিনি জানান, প্রথমবার বাগান দেখতে গিয়েই বাইনুর জাতের ২০টি আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করে নিজের যাত্রা শুরু করেন। পরে দ্বিতীয় দফায় আরও ১৫টি চারা কিনে বাড়ির উঠান ও ছাদে রোপণ করেন। বর্তমানে সেসব গাছে ফলন আসা শুরু করেছে, যা তাকে আরও উৎসাহিত করেছে।
রামপ্রসাদ আরও বলেন, বাইনুর জাতের আঙ্গুরের ফলন ভালো এবং স্বাদও অত্যন্ত উন্নত। এ কারণে তিনি প্রত্যেককে অন্তত দুটি করে আঙ্গুরের চারা রোপণের পরামর্শ দেন।
স্থানীয় আমিনুল ইসলাম ও বিষ্ণু চন্দ্র রায়সহ অনেকেই জানান, আঙ্গুর চাষের শুরুতে তারা নিজেরাও সন্দিহান ছিলেন এবং এলাকার অনেক মানুষই নানা মন্তব্য করেছিলেন। তবে উদ্যোক্তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ধৈর্যের কাছে সেই সব সংশয় টিকতে পারেনি। তাদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আজ এ সাফল্য বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
তারা আরও বলেন, এই দুই উদ্যোক্তা এখন শুধু এলাকার গণ্ডি পেরিয়ে দেশজুড়েই সুনাম অর্জন করেছেন। তাদের এই অর্জনে আমরা গর্বিত এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য কামনা করি।
কৃষি উদ্যোক্তা হাসেম আলী বলেন, ইউক্রেনে অবস্থানরত এক বন্ধুর কাছ থেকে আঙ্গুর চাষের প্রাথমিক ধারণা পান তিনি। পরে তার মামা, ব্যাংক কর্মকর্তা রুহুল আমীনের সহযোগিতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জাতের আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করা হয়। ২০১৭ সালে মাত্র ৪০টি চারা দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। শুরুতে স্থানীয়দের অনেকেই এ উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ ও কটাক্ষ করলেও তিনি থেমে থাকেননি। আট মাস পরই কয়েকটি গাছে আঙ্গুর ধরতে শুরু করে, যা তাকে আরও উৎসাহিত করে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে গাছের সংখ্যা বাড়ানো হয়।
২০১৮, ২০১৯ ও ২০২১ সালেও পরীক্ষামূলকভাবে ফলন এলেও সেগুলো আত্মীয়স্বজন ও আগ্রহী দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
২০২২ সাল থেকে তিনি বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর বিক্রি শুরু করেন। ওই বছর ৫০টি গাছ থেকে প্রায় ৫ মন, ২০২৩ সালে ১০ মন, ২০২৪ সালে ১৫ মন এবং ২০২৫ সালে ২০ মন আঙ্গুর বিক্রি করেন। চলতি ২০২৬ সালে ৬০টি গাছ থেকে ৪০–৪৫ মন ফলনের আশা করছেন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। বর্তমানে দুই বিঘা জমিতে ৪৬০টি আঙ্গুর গাছ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের চারা ৩০০ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে খরচ বাদ দিয়ে এ বছর প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
ব্যাংক কর্মকর্তা ও কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন বলেন, ২০১৭ সালেই তাদের আঙ্গুর চাষের যাত্রা শুরু হয়। ইউক্রেন ও রাশিয়ায় থাকা বন্ধুদের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নত জাতের চারা সংগ্রহ করে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে ফলন কম হলেও ২০২২ সাল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আঙ্গুর উৎপাদন হতে থাকে। এখন পর্যন্ত দুই বিঘা জমিতে বাগান গড়ে তুলতে প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আঙ্গুর ও চারা বিক্রি করে প্রায় ৬ লাখ টাকা আয় হয়েছে। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা দরে শত শত চারা বিক্রি হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকেরা তাদের কাছ থেকে চারা নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর বাগান গড়ে তুলছেন।
তিনি দাবি করেন, তাদের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই দেশে আঙ্গুর চাষের বিস্তার শুরু হয়েছে। ব্যাংকের চাকরির কারণে তিনি নিয়মিত সময় দিতে না পারলেও তার মামা হাসেম আলী প্রতিদিন বাগানের দেখভাল ও শ্রমিক পরিচালনা করছেন। ছুটির দিনে এসে তিনি পরামর্শ ও তদারকি করেন। চলতি বছরে আঙ্গুরের ফলন সবচেয়ে বেশি হয়েছে এবং ফলের স্বাদও অত্যন্ত ভালো। এই আঙ্গুরগুলো ২০ /২৫ দিন বিক্রি শুরু করতে পারবো। তিনি আশাবাদী, এ বছর শুধুমাত্র আঙ্গুর বিক্রি করেই ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা আয় সম্ভব হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. নিলুফা ইয়াছমিন বলেন, বেলে-দোঁয়াশ মাটিতে আঙ্গুর চাষ করে কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলী ফুলবাড়ীসহ পুরো কুড়িগ্রাম জেলায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের বাগানের আঙ্গুর যেমন সুস্বাদু, তেমনি ফলনও ভালো হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান স্থানীয়দের মতে, এই দুই উদ্যোক্তরা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে নতুন ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াবে এবং কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।