
গত কয়েকদিন বিকেলের পর থেকেই আকাশে জমতে থাকে কালো মেঘ। দিনভর ভ্যাপসা গরমের পর হঠাৎ করেই পরিবেশের পরিবর্তন চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টি হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই শুরু হয় দমকা হাওয়া, তারপর দ্রুতই তা তুমুল বর্ষণে রূপ নেয়। বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে দফায় ভারি বৃষ্টিতে একদিকে যেমন খানিকটা স্বস্তি মিলেছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে তাৎক্ষণিক ভোগান্তি। অফিস শেষে বাড়ি ফেরা মানুষ হঠাৎ বৃষ্টিতে বিপাকে পড়েন। অনেককে সড়কের পাশের দোকান, শপিং কমপ্লেক্স কিংবা ভবনের নিচে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। ফুটপাতের ব্যবসায়ী, হকার ও অস্থায়ী দোকানিরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। তুমুল বৃষ্টিতে সরা দ্রুত গুটিয়ে ফেলতে হয়। কোথাও কোথাও সড়কের পাশে পানি জমে অল্প সময়ের জন্য জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, ফলে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। ঝড়-বৃষ্টির এই সময়ে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দেখা দিয়েছে বজ্রপাত। বৃষ্টির সময় আকষ্মিক এই বজ্রপাতে প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত রোববারেই দেশের অন্তত আট জেলায় পৃথক ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন, এবং গবাদিপশুরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। সোমবারেও মৃত্যু হয়েছে অন্তত পাঁচজনের।
বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, রোববারের বজ্রপাতে গাইবান্ধায় পাঁচজনসহ আট জেলায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে কৃষক, গৃহবধূ, শ্রমিক, কিশোর ও বয়স্ক ব্যক্তি রয়েছেন। কোথাও মাঠে কাজ করার সময়, কোথাও বাড়ির উঠানে কিংবা গবাদিপশু আনতে গিয়ে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে গাইবান্ধায়। সদর উপজেলা ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নে বজ্রপাতে মারা গেছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ওরফে সুজা চৌধুরীর ছেলে ফুয়াদ (১৪), ছাতন মিয়ার ছেলে রাফি (১৫) এবং নবীর হোসেনের ছেলে মিজান (২০)। বিকেলে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে বাড়ির পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাদের ওপর বজ্রপাত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃতু হয়। ফুলছড়ি উপজেলার জামিরার চরে বজ্রপাতে মানিক হোসেন (২২) নামের এক যুবক নিহত হন। তিনি ঘোড়া নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। অপরদিকে সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের হলেমফা গ্রামে নজির আলী (৬৫) ছাগল দেখতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। জামালপুর সদর ও মেলান্দহ উপজেলায় বজ্রপাতে কৃষক হাসমত আলী (৪৫) ও গৃহবধূ মর্জিনা বেগম (৪০) নিহত হয়েছেন।
দুপুরে বৃষ্টির সময় চর যথার্থপুর এলাকায় মাঠ থেকে গরু নিয়ে ফিরছিলেন হাসমত আলী। আর মেলান্দহ উপজেলার কড়ইচড়া গ্রামে বাড়ির উঠানে কাজ করছিলেন গৃহবধূ মর্জিনা বেগম। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের বেত্রাশীন গ্রামের আব্দুল হামিদ (৫০) ও রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের মল্লিক চান গ্রামের হাসান আলী (২৪)। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে মাঠ ও বাড়ির উঠানে কাজ করছিলেন তারা। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় প্রথক ঘটনায় লাবনী আক্তার (৩৫) ও ইলিয়াস আলী (৩৭) নামের দু’জন বজ্রপাতে মারা যান। নিয়ামতপুর ও কোষাডাঙ্গীপাড়া এলাকায় গরুর জন্য ঘাস কাটা ও জমিতে কাজ করছিলেন তারা। নাটোরের সিংড়া উপজেলার ঠেঙ্গাপাকুরিয়া গ্রামে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে সম্রাট (২৬) নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মুচিখালী গ্রামে সুমন (৩৫) নামের এক ব্যক্তি বাড়ির পাশের জমি থেকে ছাগল আনতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারান। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা এলাকায় চা-বাগানে কাজ করার সময় বজ্রপাতে সোহরাওয়ার্দী (২৫) নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরো দু’জন আহত হয়েছেন। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে ইসলামী ফাউন্ডেশনের গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক আবুল হাসান (৪০) মারা গেছেন। রোববার দুপুরে ধানশাইল ইউনিয়নের পূর্ব চাপাঝোড়া তালতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বজ্রাঘাতে দুই নারী শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন।
আহতদের অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত দুই শিক্ষার্থী হলেন সুফিয়া আক্তার (২২) ও ফারাহ আক্তার (২২)। তারা উভয়েই রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের সহপাঠী আগলিনা জানান, বিকেলে ঝড়-বৃষ্টির সময় তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে সুফিয়া ও ফারাহ গুরুতর আহত হন। পুলিশ, হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা পানির কাছাকাছি অবস্থান না করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে, প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরীতে সোমবার প্রথক স্থানে বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি হাওরাঞ্চলে বেশি দেখা যায়। সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার অঞ্চলে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যারা গত কয়েক বছরে বজ্রপাতে একাধিক সদস্যকে হারিয়েছে। এসব মৃত্যু ঘটে একের পর এক; প্রায় নিঃশব্দে। না থাকে কোনো বৃহৎ আলোচনা, না হয় কার্যকর তদন্ত, না দেখা যায় কোনো স্থায়ী প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা। মৃত্যুগুলো যেন শুধুই একটি মৌসুমি সংখ্যা। জীবনের চেয়ে পরিসংখ্যানই যেখানে বেশি দৃশ্যমান। এই নীরব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে হাওরাঞ্চলের অনন্য ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুগত বাস্তবতা, যা একই সঙ্গে জীবনদায়ী ও প্রাণঘাতী। বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ জীবিকার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও খোলা কৃষিজমি একই সঙ্গে পরিণত হয়েছে বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রাকৃতিক ক্ষেত্র হিসেবে। নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে বজ্রপাতের তিনটি প্রধান হটস্পট রয়েছে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কঙ্গোর কিনশাসা অঞ্চল; মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ অঞ্চল এবং জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার লেক মারাকাইবো অঞ্চল সর্বাধিক বজ্রপাতপ্রবণ।
এই বৈশ্বিক মানচিত্রে সুনামগঞ্জ কোনো প্রান্তিক অঞ্চল নয়। গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র তিন মাসের মৌসুমে এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত আঘাত হানে। ভারতের মেঘালয় ও খাসি পাহাড় অঞ্চলে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত ঘন মেঘের স্তর তৈরি হয়, যা ঘর্ষণের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক চার্জ সৃষ্টি করে এবং তার প্রভাব সরাসরি পড়ে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও অনেক এলাকায় বজ্রপাতকে ‘দৈব গজব’ বা ‘নিয়তির খেলা’ হিসেবে দেখা হয়। প্রতিরোধের জায়গাকে দুর্বল করে দেয় এই মানসিকতা। অথচ আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান বলছে, বজ্রপাত একটি মিটিগেবল রিস্ক। অর্থাৎ পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কিন্তু স্বীকৃতির পরও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। সতর্কতা ব্যবস্থা থাকলেও তা মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না। কিছু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেও তার সমন্বিত ব্যবহার এখনও গড়ে ওঠেনি। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। যে দেশে প্রতিবছর একই অঞ্চলে একই ধরনের মৃত্যু ঘটে, সেখানে সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়। এটি কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। হাওরের কৃষক যখন বজ্রপাতের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে ধান কাটেন, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অনুপস্থিতির ফল। এই সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কৌশল। ঝুঁকির সুনির্দিষ্ট মানচিত্রায়ণ করতে হবে ইউনিয়ন, গ্রাম এবং ফসলি জমি পর্যায়ে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত বজ্র-নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। সতর্কতা ব্যবস্থা কেবল ওয়েবসাইট বা শহরকেন্দ্রিক বার্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে মসজিদ, মোবাইল এসএমএস, কমিউনিটি রেডিও, কৃষি অফিস এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে আচরণগত পরিবর্তন অপরিহার্য। বজ্রধ্বনি শোনামাত্র মাঠ ত্যাগ, গাছ ও পানির কাছ থেকে দূরে থাকা, নৌকায় অবস্থান না করা-এই বার্তাগুলো কেবল প্রচার নয়, বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করতে হবে। পাশাপাশি বজ্রাহত ব্যক্তির জরুরি চিকিৎসা ও প্রাথমিক সহায়তা সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে প্রাণহানি কমানো যায়।
তালগাছ রোপণসহ বৃক্ষায়নের উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি কোনোভাবেই মূল সমাধান নয়। বজ্রপাত একটি জটিল বৈজ্ঞানিক ও আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া। তাই এর সমাধানও হতে হবে প্রকৌশলভিত্তিক নিরাপদ অবকাঠামো, গ্রাউন্ডেড লাইটনিং প্রোটেকশন সিস্টেম এবং কার্যকর সতর্কতা নেটওয়ার্ক। হাওরাঞ্চলের বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; জাতীয় জননিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত। যেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, কৃষি বিভাগ এবং কমিউনিটি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করবে। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট– অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ না করলে প্রতিবছর এমন মৃত্যু ঘটতেই থাকবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution