
বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হান্টাভাইরাস। সাম্প্রতিক সময়ে একটি আন্তর্জাতিক ক্রুজ জাহাজে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখনো বৈশ্বিক মহামারির পর্যায়ে না গেলেও ইতিহাসের ভয়ংকর প্লেগ মহামারি বা ব্ল্যাক ডেথের সঙ্গে এর কিছু অস্বস্তিকর মিল রয়েছে, বিশেষ করে- ইঁদুরজাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ, দ্রুত শ্বাসতন্ত্র আক্রান্ত হওয়া ও উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে।
চলতি মাসেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, ডাচ পতাকাবাহী ক্রুজ জাহাজ ‘এমভি হনডিয়াস’- এ হান্টাভাইরাসের একটি ক্লাস্টার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। জাহাজটিতে অন্তত আটজন আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনের শরীরে ‘অ্যান্ডিজ ভাইরাস’ শনাক্ত হয়েছে, যা হান্টাভাইরাসের একটি বিপজ্জনক ধরন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে থাকা যাত্রী ও ক্রুরা বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন। সংক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের বিশেষ কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থায় নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বড় কারণ হলো, এই সংক্রমণে ব্যবহৃত অ্যান্ডিজ ভাইরাস বিরল ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে। যদিও ডব্লিইএইচও বলছে, সামগ্রিক বৈশ্বিক ঝুঁকি এখনো কম।
হান্টাভাইরাস কী?
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুর ও অন্যান্য ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর শরীরে থাকে। তাদের মূত্র, লালা বা বিষ্ঠা শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে মানুষ শ্বাসের মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। অনেক সময় সংক্রমিত ধুলাবালি পরিষ্কার করার সময়ও ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে।
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, পেশীতে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া ও পরে তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ (এইচএসপি) তৈরি করে, যা ফুসফুসে তরল জমিয়ে দ্রুত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে। ডব্লিইএইচও-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ক্রুজ জাহাজ সংক্রমণে মৃত্যুহার প্রায় ৩৮ শতাংশ ছিল।
কোথা থেকে শুরু?
হান্টাভাইরাস নতুন কোনো রোগ নয়। এর নাম এসেছে কোরিয়ার ‘হান’ নদী অঞ্চল থেকে, যেখানে ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়া যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের মধ্যে প্রথম এ ধরনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৩ সালে নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা ও আশপাশের ‘ফোর কর্নার্স’ অঞ্চলে রহস্যজনক শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবের পর এটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। পরে গবেষকরা জানতে পারেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই ইঁদুরের সংস্পর্শে এসেছিলেন।
এরপর থেকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ দেখা গেছে। আর্জেন্টিনা, চিলি ও পানামায় গত কয়েক বছরে সংক্রমণ বেড়েছে। আর্জেন্টিনায় ২০২৫ সালে নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা ৮৬-তে পৌঁছায় ও মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৩৩ শতাংশ।
জলবায়ু পরিবর্তন কি ভূমিকা রাখছে?
কিছু গবেষক মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন ইঁদুরের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে হান্টাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গবেষণা মহলেও এ নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিবৃষ্টি, বনাঞ্চল পরিবর্তন ও খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়লে ইঁদুরের বংশবিস্তারও বাড়ে। আর তখন মানুষের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
মধ্যযুগের প্লেগ: ইতিহাসের ভয়াবহতম মহামারি
হান্টাভাইরাসের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই ফিরে তাকাচ্ছেন মধ্যযুগের প্লেগ বা ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর দিকে। ১৪শ শতকে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্ল্যাক ডেথ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মহামারিগুলোর একটি।
প্লেগ রোগের জন্য দায়ী ছিল ‘ইয়ারসিনিয়া পেসটিস’ নামের একটি ব্যাকটেরিয়া, যা মূলত ইঁদুরের গায়ে থাকা মাছির মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়াতো। ইতিহাসবিদদের মতে, সেই মহামারিতে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত মানুষ মারা যায়। মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই কোটি বা তারও বেশি।
লন্ডনের ১৬৬৫ সালের ‘গ্রেট প্লেগ’-এও কয়েক মাসে প্রায় এক লাখ মানুষ মারা যায়। সেই সময় চিকিৎসাবিজ্ঞান ছিল দুর্বল, মানুষ জানতো না রোগ কীভাবে ছড়ায়। ফলে আতঙ্ক, গুজব ও সামাজিক ভাঙন ভয়াবহ আকার নেয়।
হান্টাভাইরাস ও প্লেগের মধ্যে মিল কোথায়?
দুই রোগের কারণ আলাদা- একটি ভাইরাস, অন্যটি ব্যাকটেরিয়া। তবুও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে:
উভয় রোগই মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্র আক্রান্ত হয়।
মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি।
গ্রামীণ বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকি বেশি
তবে বড় পার্থক্যও রয়েছে। প্লেগ ইতিহাসে মহামারি আকারে কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে, কিন্তু হান্টাভাইরাস এখনো সীমিত আকারে ছড়ায়। অধিকাংশ হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না; কেবল অ্যান্ডিজ ভাইরাসের ক্ষেত্রে বিরল সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কেন আবার উদ্বেগ বাড়ছে?
কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশ্ব এখন যেকোনো নতুন সংক্রমণকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হান্টাভাইরাস বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারির পর্যায়ে না থাকলেও এটি ‘উপেক্ষা করার মতো’ রোগ নয়।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের অনুপ্রবেশ বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের সংক্রমণ আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। ইতিহাস দেখিয়েছে, ছোট বলে মনে হওয়া সংক্রমণও কখনো কখনো বড় বিপর্যয়ের সূচনা হতে পারে। আর সে কারণেই হান্টাভাইরাস নিয়ে বর্তমান উদ্বেগকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে নয়, বরং মানবসভ্যতার অতীত মহামারির অভিজ্ঞতার আলোকে দেখছেন গবেষকেরা।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution