
নীলফামারীর ডিমলায় সরকারি খাদ্য গুদামের খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ ও ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) নবাবের বিরুদ্ধে ধান ছাঁটাইয়ের নামে নিম্ন মানের চাল সংগ্রহে লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যে সরকারের দেড় কোটি টাকার অধিক আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়াও এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ডিলারদের কাছ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সাংবাদিক, শ্রমিকদের নাম করে ঘুষ নেয়া, মাস্টার রোলের নামে ঘুষ নেয়া, বড় বস্তায় চাল দেয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেয়া, বিভিন্ন ডিলারদের আমন চালের পরিবর্তে বোরো চাল সরবরাহ করাসহ ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি সময়ে রক্ষক এই দুই কর্মকর্তার ভক্ষকের ভুমিকা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে এসেছে সাপ!
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত আমন মৌসুমে সরকার প্রতি মণ ১ হাজার ৩৬০ টাকা মুল্যে ২ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করেন। এই উপজেলায় ধান সংগ্রহের পর খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ ও ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা নবাবের যোগসাজশে জহির ওরফে দরবেশ জহির নামে এক ব্যবসায়ী সালভি অটো রাইস মিলের সাথে চুক্তি করেন। পরে সেই মিলের নামে সরকারের সাথে ধান ছাঁটাইয়ের চুক্তি করে সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে ১৪৫৪ মেট্রিক টন ধান নেন ছাঁটাইয়ের জন্য।
একি ভাবে ফরিদুল নামের অপর এক ব্যবসায়ী জলঢাকার এস আলী অটো রাইস মিল চুক্তিতে নিয়ে সেই মিলের নামে ধান ছাঁটাই করে চাল সরকারি গুদামে সরবরাহ করার জন্য ৬০০ মেট্রিক টন, মা রেজিয়া নামের নাম সর্বস্ব হাসকিং মিলের নামে ৩০ মেট্রিক টন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সদরের ভাই-ভাই হাসকিং মিলের নামে ৩০ মেট্রিক টনসহ মোট ৬৬০ মেট্রিক টন ধান নেন।
ধান থেকে চাল ছাঁটাই করণের জন্য ও যাতায়াত খরচ বাবদ সরকার সেইসব চুক্তিবদ্ধ মিলারদের টন প্রতি ১ হাজার ১৫০ টাকা করে খরচ দেন। নিয়ম মোতাবেক সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ সেইসব মিলাদের খাদ্য গুদাম থেকে নেয়া আমন ধানের প্রতি টন ধান ছাঁটাই করে সরকারি গুদামেই দিতে হবে ৬৮০ কেজি চাল। অর্থাৎ ছাঁটাইয়ের পর প্রতি কেজি চাল সরকারের কেনা পড়ে ৫০ টাকা হিসেবে টন ৫০ হাজার টাকা।
কিন্তু জহির ও ফরিদুল খাদ্য গুদাম থেকে ধান নিয়ে বেশি মুল্যে বিক্রি করে দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সর্বনিম্ন ৩২ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা টন মুল্যে নিম্ন মানের চাল কিনে ও একি মূল্যে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের (ডিও) চাল কিনে তা খাদ্য গুদাম থেকে বের না করে সেখানে রেখেই অভিনব কৌশলে ছাঁটাইয়ের চাল হিসেবে দেখিয়ে গড় দুই-তৃতীয়াংশ চাল এডজাস্ট করেন এই দুই কর্মকর্তার যোগসাজশে।
এতে প্রতি মেট্রিক টনে খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ ও ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা নবাব ৩ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়ে হাতিয়ে নেন প্রায় ২৮ লাখ টাকা। আর ছাঁটাইয়ের নামে এই নিম্ন মানের চাল গড় সর্বোচ্চ ৩৪ হাজার টাকা টন হিসেবে ধরলেও তাতে সরকারের ক্ষতি হয় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৪ হাজার ও ছাঁটাই না করেও ছাঁটাই বাবদ নেয়া ১০ লাখ ৬৪ হাজার টাকাসহ মোট ১ কোটি ৫৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। গত এপ্রিল মাসে খাদ্য গুদামের এই দুই কর্মকর্তার যোগসাজশে ব্যবসায়ী ফরিদুলের শ্যালক খাদ্য বান্ধবের ডিলার তইবুল ইসলামকে খাদ্য গুদাম থেকে চাল না দিয়ে গোপনে ফরিদুলের শুটিবাড়ি মোড়ের ব্যক্তিগত গুদাম থেকে নিম্ন মানের চাল দিয়ে উপকারভোগিদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
ডিলার তইবুল খাদ্য গুদাম থেকে বিতরণের জন্য যে ১৫ দশমিক ৮৭০ মেট্রিক টন চাল নেয়ার কথা তা ব্যবসায়ী ফরিদুলের নামে সরকারি খাদ্য গুদামে জমা রাখা হয়। পরে খাদ্য গুদাম থেকে বের না করা ওই চাল ও ফরিদুল ইসলামের সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের (ডিও) কিনে খাদ্য গুদামে রাখা চালের সাথে সমন্বয় করে মা রেজিয়া ও ভাই-ভাই হাসকিং মিলের নামে প্রায় ৪০ মেট্রিক টন চাল বুঝিয়ে পেয়েছেন মর্মে এই দুই কর্মকর্তা প্রত্যয়ন দেন।
প্রত্যয়ন পেয়ে মিল দুটির মালিকের নামে জেলা খাদ্য বিভাগ পে-অর্ডার (বিল) প্রদাণ করেন। শুধু তাই নয়, বরাবরের মত খাদ্য বান্ধব কর্মসুচির ৪১ টি ডিলারের এপ্রিল মাসে চাল সরবরাহ করার সময় মাস্টার রোল (উপকারভোগিদের তালিকা) বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা, শ্রমিকদের মে দিবসের জন্য ৫০০ টাকা ও সাংবাদিকদের জন্য ৩০০ টাকা করে মোট ২ হাজার টাকা করে ডিলার প্রতি নিজের বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী জহিরকে দিয়ে ঘুষ নেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ।
এছাড়াও তিনি টিসিবির ১০ ডিলারকে চাল সরবরাহকারি ওএমএস তিন ডিলারের কাছ থেকে প্রতিবারের ন্যায় চাল সরবরাহ করার সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কথা বলে ২০ হাজার টাক ঘুষ নেন। পূর্বে ডিলারদের কাছে চাল সরবরাহ করার সময় খাদ্য গুদামের নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীর ও অপর ব্যবসায়ী অপুর মাধ্যমে এই ঘুষ বাণিজ্য করা হতো। তবে নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীর গতবার ডিলারদের চাল সরবরাহ করার সময় নেয়া ঘুষের কিছু টাকা হারিয়ে ফেলেছেন বলে আত্মসাত করায় এই দায়িত্ব নেন এবার ব্যবসায়ী জহির।
বড় বস্তা (৫০ কেজি) বেশি মূল্য হওয়ার কারণে খাদ্য বান্ধব ডিলারদের বরাবরই চাহিদা থাকে সেই বস্তার। দুই কর্মকর্তার প্রতিযোগিতামুলক ঘুষ বাণিজ্যে ৪১টি ডিলারের মধ্যে ১৪ জন ডিলারকে বড় বস্তায় চাল সরবরাহ করে প্রতি ডিলারের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নেন ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা নবাব। বড় বস্তার বিনিময়ে ঘুষের টাকা বেশকিছু ডিলারের কাছ থেকে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা নবাব সরাসরি নিজে নিলেও তার অবর্তমানে সেই টাকাও আদায় করেন ব্যবসায়ী জহির। আবার চাল বিতরণ শেষে ওইসব ডিলারদের কাছ থেকে ৪৫ টাকা দরে প্রতি বস্তা কিনে নেন দরবেশ জহির নিজেই।
এছাড়াও একাধিক পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে থাকা ডিলারদের চাল জহির, অপুসহ বেশকিছু ব্যবসায়ীকে বিতরণের সুযোগ করে দিয়ে তাতেও মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে নেন এই দুই কর্মকর্তা। যার প্রভাব প্রতিনিয়তই পড়ছে সরকার ও সাধারণ উপকারভোগিদের উপর।
পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়ের খাদ্য বান্ধব ডিলার চাল কম দেয়ার খবরে সংবাদকর্মীরা সেখানে ছুটে গেলে ডিলার আব্দুল গফুর বলেন, মাস্টার রোলের (উপকারভোগিদের তালিকা) বাবদ ১ হাজার ২০০, সাংবাদিকদের জন্য ৩০০, ২৬ শে মার্চের জন্য ৫০০ টাকা ঘুষ দিয়ে চাল নিয়ে তবুও চাল কম পেয়েছি। কম না দিলেতো আমাদের ক্ষতি হয়ে যাবে। ডিলারি হারানোর ভয়ে একাধিক খাদ্য বান্ধব ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বড় বস্তার জন্য ৫ হাজার, মাস্টার রোলের জন্য ১হাজার ২০০, সাংবাদিকদের জন্য ৩০০, মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিকদের জন্য ৫০০ টাকা দিয়ে চাল নিয়েছি। তবুও অনেকেই চাল কম পেয়েছি।
মিল চুক্তিতে নিয়ে ধান ছাঁটাই করা এক ব্যবসায়ী বলেন, ধান ছাঁটাইয়ের চাল দিতে গিয়ে তিন হাজার টাকা করে প্রতি টনের জন্য দিয়েছি। এছাড়াও ওসিএলএসডির কাছে কয়েক লাখ টাকা হাওলাদি পাবো। ওএমএসের এক ডিলার বলেন, আমাদের তিনজন ডিলারের মাধ্যমে টিসিবির ১০টি ডিলারকে চাল সরবরাহ করা হয়। প্রতিবার এই চাল সরবরাহ করার সময় টিসিএফ স্যার (খাদ্য নিয়ন্ত্রক) আমাদের তিন ডিলারের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেন।
তবুও অনেক সময় পুরোনো ছেঁড়া বস্তা, বোরো চাল ও কখনো আমন-বোরো মিশ্রিত চাল গুদাম থেকে দেয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিসিবির এক ডিলার বলেন, গত বিতরণে আমাদের মোটা (বোরো) চাল দেয়া হয়েছে। এর আগে এ বিষয়ে খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর স্যারকে একবার অভিযোগ করতে গেলে তিনি জানান, আপনারা আমার কাছে এসেছেন কেনো। আপনাদের যারা চাল সরবরাহ করেন আপনারা তাদের অভিযোগ করবেন তারা আমাকে অভিযোগ করবেন। তাই আর কাওকে অভিযোগ না করে উপকারভোগিদের বলে দেই যে, চাল বাদেও কেউ যদি শুধু অন্যান্য পণ্য গুলো নিতে চান নিতে পারবেন।
সরেজমিনে ভাই-ভাই হাসকিং মিলে গিয়ে দেখা যায়, মিলটির ভিতরে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য দিয়ে বোঝাই। পরে এলাকাবাসি সুত্রে জানা যায়, মিলটি দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। এখন এক ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য ব্যবসায়ী সেটিকে তার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ সময় মিলটির প্রোপাইটর রফিকুল ইসলাম বলেন, মিল আমার বন্ধ নেই প্রতিমাসে বৈদ্যুতিক বিল আসে। তবে আমি নোকাল ছাঁটাই করিনা।খাদ্য গুদামে হাসকিং মিলের ছাঁটাই নেয়া হয়না তাই অটো মিল থেকে ছাঁটাই করে এনে গুদামে দিয়েছি। বর্তমানে ফরিদুল ভাই সবকিছু করছে।
গত ২০ থেকে ২৫ দিন আগেও তিনি আমার কাছে ছাঁটাইয়ের বিলের জন্য চেক নিয়ে গেছেন। মা রেজিয়া হাসকিং মিলের প্রোপাইটর রেজাউল করিম বলেন, ঝামেলার কারণে চাল দিতে দেরি হলেও আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নিয়েছি। গত এপ্রিল মাসের কত তারিখে পে-অর্ডারটি পেয়েছি তা মনে নেই, কাগজপত্র দেখতে হবে।
ব্যবসায়ী জহির বলেন, মাস্টার রোল, সাংবাদিক ও মে দিবসের জন্য ২হাজার টাকা করে আমি নিয়েছি। ওসিএলএসডির টাকা নেইনি। খাদ্য গুদাম শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা কোনো টাকা পাইনি। কেউ আমাদের কোনো টাকা দেয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) নবাব তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি ঘুষ বাণিজ্যও করিনা ও মাস্টার রোলও দেইনা।
খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ বলেন, আমি বাহিরে আছি, রাত ১০টায় আমাকে কল দিয়েন। পরে রাত ১০টায় তাকে কল দেয়া হলে তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ আতিকুল হককে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমন কি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।
তবে এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, আমরা এবার ঈদুল আযহা উপলক্ষে ভিজিএফ চাল বিতরণে আরও স্বচ্ছতা আনতে একটি ইউনিয়নে দুজন করে ট্যাগ অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছি। পাশাপাশি পুলিশ-গ্রাম পুলিশও বিতরণে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ গুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে আসলে আমাকে আগে জানতে হবে। যদি আসলেই কোনো অনিয়ম হয় ও রাষ্ট্রীয় টাকা অপচয় হয় তাহলে আমি ওনাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানাবো।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution