
নিত্যনতুন স্মার্টফোন কিনতে চায় সবাই। এ কারণে যেমন পরিবেশের ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ, তেমনি অপচয় হচ্ছে অর্থ, বাড়ছে ডিজিটাল আসক্তি। নতুন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ফিচার উপভোগ করতে প্রতিবছর নতুন স্মার্টফোন কেনে অনেকেই। তবে প্রযুক্তিপণ্যের বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, ফোন বদলানো উচিত দুই-তিন বছর পর পর। এতে পরিবেশদূষণ এবং অর্থ অপচয়—দুটোই কমবে।
কেন স্মার্টফোন বদলের প্রবণতা
অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের তুলনায় ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্মার্টফোন বদলের প্রবণতা অনেক বেশি। এর কারণ বোঝার জন্য ফিরে যেতে হবে ১৯ বছর আগে।
২০০৭ সালে প্রথম বাজারে আসে আইফোন। দেড় বছর পর ২০০৮ সালের মাঝামাঝি গুগল শুরু করে অ্যানড্রয়েড স্মার্টফোন বিক্রি। প্রযুক্তিবিদদের মতে, এটাই স্মার্টফোন যুগের শুরু। এর আগেও স্মার্টফোন ঘরানার কিছু ডিভাইস বাজারে ছিল। এগুলোর ব্যবহারকারী ছিল খুব কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডিভাইসগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা হতো। ই-মেইল আদান-প্রদান, ক্যালেন্ডার ও কন্ট্যাক্টস সেভ করা, অল্পবিস্তর ইন্টারনেট ব্রাউজিং এবং অফিস ডকুমেন্ট পড়ার ফিচার থাকাই ছিল যথেষ্ট।
আইফোন বা অ্যানড্রয়েড যখন বাজারে আসে, ঠিক সেই সময় প্রসার ঘটে থ্রিজি নেটওয়ার্কের। পাশাপাশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ফেসবুক এবং টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
বহনযোগ্য ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গান শুনতেও অভ্যস্ত হয়ে ওঠে ব্যবহারকারীরা। ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারের ধরন বদলে যায়। এটি হয়ে ওঠে চলার পথে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ও বিনোদোনের মাধ্যম। ছবি তোলা, একাধিক অ্যাপ চালনা, গেমিং, ওয়েব ব্রাউজিং, ভিডিও ধারণ ও অন্যান্য মাল্টিমিডিয়া কাজের জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে স্মার্টফোন। ব্যবহারকারীদের মধ্যে তৈরি হয় শক্তিশালী প্রসেসর, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি লাইফ, উচ্চমানের ক্যামেরা ও ডিসপ্লে এবং নতুন ফিচারে ভরপুর অপারেটিং সিস্টেমের চাহিদা। ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারে বড় আপডেট নিয়ে হাজির হয়েছে নির্মাতারা। দেখা গেছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে স্মার্টফোনের প্রসেসিং ক্ষমতা, স্টোরেজ, ব্যাটারি লাইফ হয়ে গেছে দ্বিগুণ। ফলে অনেক ব্যবহারকারীর মধ্যে তৈরি হয় প্রতিবছর স্মার্টফোন বদলের প্রবণতা। বেশির ভাগ ব্যবহারকারী ফোন আপডেট করত দেড় বছরের মধ্যে।
বদলেছে স্মার্টফোন বাজার
নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো প্রতিবছর বাজারে আনছে নতুন মডেলের স্মার্টফোন। তবে হার্ডওয়্যারে তফাত সামান্যই। যেমন—গুগল পিক্সেল ৯এ এবং ১০এ মডেলগুলোর মধ্যে তফাত এতই কম যে হাতে নিয়েও অনেক ব্যবহারকারীর পক্ষে হার্ডওয়্যারের আপডেটগুলো বুঝে নেওয়া অসম্ভব। আইফোন ১৬ ও ১৭ সিরিজের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে। আইওএস ১৮ ও ২৬-এর মধ্যে ইন্টারফেস ডিজাইন ছাড়া ফিচারের আপডেট সামান্যই, অ্যানড্রয়েড ১৩ এর পর তেমন বড় আপডেট দেখা যায়নি। স্মার্টফোন নির্মাতারা নতুন সফটওয়্যার ফিচার আনেনি এমন নয়, তবে সেগুলো আলাদা অ্যাপের মাধ্যমে পুরনো অপারেটিং সিস্টেমেও পৌঁছে দিয়েছে তারা। প্রযুক্তি বাজার বিশ্লেষকদের দাবি, ফ্ল্যাগশিপ বা মাঝারি মূল্যের স্মার্টফোনগুলো এখন তিন বছর পর্যন্ত অনায়াসে ব্যবহার করা যায়, ব্যাটারি হেলথ ঠিক থাকলে চার-পাঁচ বছরও আরামসে ব্যবহার করা সম্ভব। ফোনকে পুরনোও মনে হবে না, কারণ নতুন মডেলগুলোর সঙ্গে তেমন বড় কোনো তফাত নেই।
পরিবেশ বাঁচানো জরুরি
২২ এপ্রিল পৃথিবী দিবসে ই-বর্জ্য কমানো নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বহু পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, স্মার্টফোন কেনার প্রবণতা কমানোর মাধ্যমে ই-বর্জ্য ও পরিবেশদূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একটি স্মার্টফোন তৈরিতে প্রয়োজন ৭০টিরও বেশি মৌল। এর মধ্যে ইন্ডিয়াম, লিথিয়াম, নিকেল ও ম্যাগনেসিয়াম অন্যতম। এগুলোর আকর উত্তোলন, পরিশোধন ও পরিবহনের ফলে পরিবেশ দূষিত হয়। লিথিয়ামের জোগান দেয় ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর মতো দেশগুলো, যেখানে মানবেতর পরিবেশে দাসপ্রথার মাধ্যমে খনি থেকে আকর সংগৃহীত হয়। কোবাল্টের মতো বিষাক্ত ধাতুও কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই শ্রমিকরা উত্তোলন করেন। স্মার্টফোনের চাহিদা কমলে এ ধরনের খনিজের চাহিদা কমবে। এসব খনির মালিকরা বাধ্য হবে ব্যবসা গোটাতে। পরিবেশদূষণের হারও কমে আসবে। প্রতিবছর ফোন কেনা বন্ধ করলে ফোন নির্মাতারাও প্রোডাকশন কমাতে বাধ্য হবে। এতে পরোক্ষভাবেও পরিবেশের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে।
বাতিল স্মার্টফোন পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। স্মার্টফোন রিসাইক্লিং করে মাত্র ৩৯ শতাংশ ব্যবহারকারী। বাংলাদেশে এ সংখ্যাটি আরো অনেক কম। বেশির ভাগ নষ্ট বা বাতিল স্মার্টফোনের শেষ ঠিকানা হয় আবর্জনার স্তূপ। এর মধ্যে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক ধীরে ধীরে মাটি ও পানিতে মিশে যায়। ২০২২ সালে চালানো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা অনুযায়ী প্রতিবছর শুধু স্মার্টফোনজনিত ই-বর্জ্য থেকেই ছয় কোটি ২০ লাখ টনেরও বেশি দূষিত পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। পরিবেশ বাঁচাতে তাই ফোন কেনার প্রবণতা কমানোর পাশাপাশি গড়তে হবে রিসাইকল করার অভ্যাস।
অভ্যাস পরিবর্তন
ডিজিটাল আসক্তি কমানো অত্যন্ত জরুরি। মানব মস্তিষ্ক সব সময় নতুন অভিজ্ঞতা খুঁজে বেড়ায়, একই জিনিস বারবার দেখলে এ সময় সেটির প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। একই ফোন দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কারণে-অকারণে ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমে যাবে। ব্যবহারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য স্মার্টফোন নির্মাতারা প্রতিনিয়ত নতুন সব ফিচার যোগ করে থাকে। এখন চলছে নানাবিধ এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ও চ্যাটবট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার চল। যে কাজের জন্য হয়তো অ্যাপ খুলে দুটি ট্যাপ করাই যথেষ্ট, সেটার জন্যও এআইয়ের সঙ্গে কথোপকথন চালানোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, এতে দীর্ঘ সময় ধরে স্মার্টফোন ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছে ব্যবহারকারীরা। পুরনো ফোন ব্যবহার করলে এসব চটকদার ফিচার এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, তরুণরাই প্রতিবছর স্মার্টফোন পরিবর্তন করে বেশি। তারা মনে করে, পুরনো ফোন ব্যবহার করলে সামাজিক মর্যাদা কমে যাবে। হাতের স্মার্টফোনটিকে আত্মমর্যাদার অংশ গণ্য করা উচিত নয়। অনেকেই এ জন্য বছরের পর বছর ক্রেডিট কার্ড বিলের চক্করে আটকে থাকে। ব্যয় কমানো এবং অর্থের সঠিক ব্যবহারের জন্যও ঘন ঘন স্মার্টফোন বদলানোর অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত।
কেমন স্মার্টফোন কেনা উচিত
অন্তত ৬-৮ জিবি র্যাম, ১২৮-২৫৬ জিবি স্টোরেজ এবং অন্তত ৪৫০০-৫০০০ এমএএইচ ব্যাটারির স্মার্টফোন কিনলে বহুদিন পর্যন্ত সেটি পারফরম্যান্স ধরে রাখবে। এ জন্য বাজেট হতে হবে কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এমন একটি ডিভাইস অন্তত তিন-চার বছর ব্যবহারযোগ্য থাকবে। বাজেট কম হলেও ৪ জিবি র্যাম, ৬৪ জিবি স্টোরেজ এবং ৩ হাজার এমএএইচের কম ধারণক্ষমতার ব্যাটারির ফোন কেনা উচিত নয়। কারণ সময়ের সঙ্গে ব্যাটারির ধারণক্ষমতা কমবে, ফোনের স্টোরেজও ভরে যাবে। পর পর দুই বছর স্মার্টফোন কেনায় সর্বনিম্ন ১০ হাজার করে ২০ হাজার টাকা খরচ না করে একবারে ২০ হাজার টাকার স্মার্টফোন কিনে তিন বছর ব্যবহার করলে সাশ্রয় হবে ১০ হাজার টাকা।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution