
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা দেশের কিশোরদের জীবনধারায় বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। একসময় মাঠ, স্কুল কিংবা পাড়া-মহল্লার আড্ডায় সীমাবদ্ধ থাকা কিশোরদের বড় একটি অংশ এখন সময় কাটাচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে। তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশেষজ্ঞদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে কিশোর গ্যাংগুলো সদস্য সংগ্রহ, যোগাযোগ রক্ষা, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ও অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংগঠনের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের অধিকাংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করত। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাংয়ের আধিপত্য প্রদর্শন, অস্ত্রের ছবি প্রচার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপকে হুমকি দেওয়ার জন্যও এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রবণতা এবং অনুসারী বাড়ানোর প্রতিযোগিতা অনেক কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমানে খুব অল্প বয়স থেকেই শিশু-কিশোররা স্মার্টফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। অতিরিক্ত অনলাইন নির্ভরতার কারণে তাদের আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং মূল্যবোধে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেকেই পরিবার ও সমাজের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে এবং আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি সংস্কৃতি ও জীবনধারার অন্ধ অনুসরণ কিশোরদের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা বাড়াতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আইন পাস করেছে। আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মকে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ফ্রান্সও। এছাড়া ব্রিটেন, নরওয়ে, স্পেন ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা বা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে একটি মোবাইল নোটিফিকেশনও শিক্ষার্থীর মনোযোগে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, প্রযুক্তির সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা সমাধান নয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, অনেক শিশু-কিশোর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে শিক্ষা, বই পড়া, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো গঠনমূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হচ্ছে। তাই প্রযুক্তিকে বাদ না দিয়ে এর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন কার্যক্রমে অভিভাবকদের নজরদারি বৃদ্ধি, ডিজিটাল সচেতনতা শিক্ষা এবং প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution