
চার বছর আগে যখন ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল বিতর্ক। অনেকের আশঙ্কা ছিল, ছোট দল বাড়লে ম্যাচের মান কমে যাবে, গ্রুপ পর্ব একঘেয়ে হয়ে উঠবে এবং টুর্নামেন্ট অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ হবে। আবার ফিফার যুক্তি ছিল ভিন্ন। আরও বেশি দেশ সুযোগ পাবে, ফুটবল ছড়িয়ে পড়বে নতুন অঞ্চলে, আর বিশ্বকাপ হবে সত্যিকার অর্থেই বৈশ্বিক।
চার বছর পর এবার পরিবর্ধিত বিশ্বকাপে ৭২টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শেষে বলা যায়, দুই পক্ষের যুক্তিতেই মিলেছে সত্যতার ছাপ। সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল ছোট দেশগুলোর উত্থান। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, ঘানা, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলো প্রমাণ করেছে, বিশ্বকাপে তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি; প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও এসেছে। কেপ ভার্দে স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে পরে নকআউটে জায়গা করে নেয়। কুরাসাও ইকুয়েডরের বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট অর্জন করে। ঘানা ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলে, দক্ষিণ আফ্রিকাও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই উপহার দেয়।
ফলে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ মানেই একপেশে ম্যাচ এমন ধারণা অনেকটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং ছোট দলগুলো উন্নত কৌশল, সংগঠিত রক্ষণ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবলের মাধ্যমে দেখিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে শুধু তারকায় নয়, পরিকল্পনাতেও ম্যাচ জেতা যায়। তবে সমালোচনার জায়গাও কম নয়। গ্রুপ পর্বের শেষ কয়েকটি ম্যাচে নতুন ফরম্যাটের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া জানত, ড্র করলেই দুই দলই নকআউটে উঠবে, আর হারলেই বিদায়। সেই পরিস্থিতিতে ম্যাচের শেষ ভাগে আক্রমণাত্মক ফুটবলের বদলে দুই দলই ঝুঁকি কমিয়ে খেলে। ৬৮ মিনিটের পর দীর্ঘ সময় কোনো শটই দেখা যায়নি। যোগ করা সময়ে আলজেরিয়া গোল করলেও মুহূর্তেই সমতা ফেরায় অস্ট্রিয়া। ৩-৩ ড্রয়ে দুই দলই শেষ ৩২ নিশ্চিত করে, আর বিদায় নিতে হয় ইরানকে।
নিয়মের মধ্যে থেকেও এমন পরিস্থিতি প্রশ্ন তুলেছে নতুন ফরম্যাট নিয়ে। একই সময়ে সব ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব না হওয়ায়, পরে খেলা দলগুলো আগের ফল জেনে মাঠে নামছে। এতে কখনো কখনো ড্র ই দুই দলের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের প্রতিযোগিতামূলক তীব্রতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে বড় ছবিতে তাকালে গ্রুপ পর্ব দর্শকদের হতাশ করেনি। লিওনেল মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে, আবার কেপ ভার্দের মতো ছোট দেশ কোটি সমর্থকের হৃদয় জয় করেছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ৪৮ দলের এই গ্রুপ পর্ব ছিল মূল লড়াইয়ের প্রস্তুতি। ৭২ ম্যাচে দলগুলো নিজেদের ছন্দ খুঁজেছে, ভুল শুধরে নিয়েছে এবং নকআউটের জন্য তৈরি হয়েছে। এখন আর কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। একটি হার মানেই বিদায়, একটি জয় মানেই আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তাই নতুন ফরম্যাট নিয়ে বিতর্ক এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। গ্রুপ পর্বে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা চোখে পড়লেও প্রতিযোগিতার বিস্তার, নতুন দেশের উত্থান এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের প্রসারের দিক থেকে ফিফার পরীক্ষাকে আপাতত সফলই বলা যায়। গ্রুপ পর্ব শেষ। এখন আর সমীকরণের খেলা নয়, শুরু হলো সত্যিকারের বিশ্বকাপ। নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই হবে বাঁচা-মরার লড়াই। আর সেখানেই বোঝা যাবে, ৪৮ দলের নতুন এই বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে সফল পরীক্ষার উদাহরণ হয়ে থাকে, নাকি ভবিষ্যতে আবারও পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution