
জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, বাজেট অধিবেশনে দেওয়া তার কিছু বক্তব্য সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি, স্পিকারের পূর্ববর্তী রুলিং এবং বিচারাধীন বা আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রচলিত রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
সংসদীয় গণতন্ত্রে আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি বিভাগের সাংবিধানিক সীমারেখা ও পারস্পরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকলেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও আদালতের বিচারাধীন কিংবা আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় সংসদে আলোচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতেই এসব রীতি অনুসরণ করা হয়।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর আদালতের কার্যকর নজরদারি এবং আদালতের রায় মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একইভাবে যুক্তরাজ্য ও ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থাতেও বিচার বিভাগের বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংসদীয় রীতি অনুসরণ করা হয়।
গত ২৫ জুন জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ দেশের একটি শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেন। এ বক্তব্যের পর সংসদীয় রীতিনীতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সমালোচকদের দাবি, গত ২১ জুন স্পিকারের দেওয়া একটি রুলিংয়ে বলা হয়েছিল, যেসব ব্যক্তি সংসদে উপস্থিত থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান না, তাদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা উচিত নয়। একই সঙ্গে ওই ধরনের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তাদের মতে, ২৫ জুনের বক্তব্য সেই রুলিংয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৭০ নম্বর বিধিতে বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য, অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং সংসদে উপস্থিত নন—এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানিকর মন্তব্য না করার বিধান রয়েছে। সংসদ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এসব বিধান সংসদের মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যেই প্রণীত।
এদিকে হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে যে মামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন, সেটি আদালতে আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দায়ের হওয়া ওই মামলায় দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালে আদালত অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেন। পরবর্তীতে বাদীপক্ষের করা নারাজি আবেদনও সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল খারিজ করেন। ফলে আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় সংসদে পুনরায় আলোচনায় আনা কতটা সমীচীন—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজ্ঞদের একাংশের মতে, সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের পারস্পরিক ভারসাম্য রক্ষা করা গণতন্ত্রের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভাষ্য, কোনো বিভাগের এখতিয়ারে অন্য বিভাগের অযাচিত হস্তক্ষেপের ধারণা সৃষ্টি হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
অন্যদিকে, হাসনাত আবদুল্লাহ বা তার দলের পক্ষ থেকে এ সমালোচনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্যের পক্ষে ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সংসদে নির্বাচিত তরুণ সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে সংসদীয় রীতিনীতি, বিতর্কের সংস্কৃতি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা প্রত্যাশা করে সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, সংসদকে কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ রাখতে সব সদস্যেরই কার্যপ্রণালী বিধি ও স্পিকারের নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution