
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় ও জানাজায় সমবেত লাখো মানুষের কণ্ঠে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে তেহরান। শনিবার ভোরে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্স এবং এর চারপাশের এলাকায় লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। শোকমিছিলে অংশ নেওয়া হাজারো মানুষের হাতে ছিল লাল রঙের ব্যানার ও পতাকা, যা শিয়া ইসলামি সংস্কৃতিতে মূলত ‘প্রতিশোধের প্রতীক’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সমবেত জনতা বুক চাপড়ে এবং অত্যন্ত আবেগঘন হয়ে ‘আমাদের স্লোগান একটিই—প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধ্বংস হোক’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। কিছু ব্যানারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
এদিকে বিশাল ধর্মীয় কমপ্লেক্সে খামেনির কফিন স্থাপনের পর দেশটির ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং অন্যান্য শোকাহত মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ ও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিও উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া ইরাক, আর্মেনিয়া, তুরস্ক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও শোকযাত্রায় অংশ নিতে সেখানে পৌঁছেছেন। এসব দেশের মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানও রয়েছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন তেহরানকে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে দাফন করার জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে, ‘কারণ আমরা ভালো’।
উল্লেখ্য, প্রায় ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকা ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর প্রথম দিকেই নিহত হন। চার মাসের বেশি সময় পর তাকে দাফনের আনুষ্ঠানিকতা চলছে। এই আয়োজনকে ইরানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বিপ্লবী আদর্শের প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শনের একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খামেনির মরদেহ ইরান ও ইরাকের প্রধান শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কোম, নাজাফ এবং কারবালায় নেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার তাকে দেশটির সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান ও তার নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন জনসাধারণের সামনে আনা হয়। সে সময় কান্নারত সমর্থকদের একটি বড় দল সেখানে উপস্থিত ছিল। শোকগাঁথা গাওয়ার তালে তালে তারা দুলছিলেন এবং মাথায় আঘাত করছিলেন। এ সময় কফিনের ওপর থেকে ফুল ছুড়ে দেওয়া হয় জনতার দিকে।
শুক্রবার তার কফিন এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিন শায়িত রাখা হয় সেই বৃহৎ নামাজের হলে, যা তার পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সম্মানে নির্মিত হয়েছিল। ইরানের জন্য খামেনির এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠান এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সমর্থনপুষ্ট ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ থেকে টিকে যাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের বড় শোকযাত্রাগুলোয় লাখো মানুষকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে কর্তৃপক্ষ পরিবহন, খাবার ও থাকার ব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছে।
সব মিলিয়ে খামেনির প্রতি শোক জানাতে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ইরানি কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।
এদিকে বিশাল এই আয়োজনে খামেনির ছেলে ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো দেখা যায়নি। এমনকি তিনি তার পরিবারের সদস্যদের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় উপস্থিত থাকবেন কি না সে ব্যাপারে এখনো কিছু জানানো হয়নি তার কার্যালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে। রয়টার্স জানায়, তেহরানের সড়কগুলোয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রধান সড়কজুড়ে মোতায়েন রয়েছে সামরিক ও পুলিশ যানবাহন, আর পুলিশ সদস্য ও কালো পোশাক পরিহিত স্বেচ্ছাসেবী বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেলে টহল দিচ্ছিলেন। এদিকে জানাজা চলাকালে কোনো হামলা চালানোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্কও করেছে ইরান।
সূত্র: বিবিসি।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution