
প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ১৭, ২০২৬, ১১:০৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ১৭, ২০২৬, ৭:৫২ পি.এম
একটি গরুই বদলে দিয়েছে সুফিয়া জামানের জীবন

মাত্র ৭ হাজার টাকা ঋণ আর একটি গাভী। সেই একটি গরু দিয়েই শুরু হয়েছিল পথচলা। দীর্ঘ ৩১ বছরের পরিশ্রম, ধৈর্য আর আত্মবিশ্বাসের ফল আজ ২৩টি গরুর একটি সফল খামার। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নারী খামারি সুফিয়া জামান এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার রণগাঁও ইউনিয়নের পার্বতীপুর গ্রামের বাসিন্দা সুফিয়া জামানের বর্তমান বয়স ৪৫ বছর। এসএসসি পাস করা এই নারী উদ্যোক্তা ১৯৯৫ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে, নবম-দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ৭ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি গাভী কিনেছিলেন। সেই একটি গরু দিয়েই শুরু হয় তার খামারের পথচলা।
দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসে আজ তার খামারে রয়েছে ২৩টি গরু, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। সুফিয়া জামান জানান, খামার শুরু করার সময় সমাজের নানা নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাকে। বিয়ের আগেই গরু পালন করায় গ্রামের অনেকেই বলতেন, "কিছুদিন পর তো তোমার বিয়ে হবে, গরু পালন করে কী হবে?" আবার অনেকে মনে করতেন, তার পক্ষে এ কাজে সফল হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি কারও কথায় কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যেই অটল ছিলেন।
তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করতাম, পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই। তাই মানুষের কথায় থেমে যাইনি। এখন যারা একসময় নিরুৎসাহিত করতেন, তারাই খামার করার বিষয়ে আমার কাছে পরামর্শ নিতে আসেন।"
বর্তমানে তার খামারে ২৩টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী এবং ৬টি গাভী নিয়মিত দুধ দিচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত দুধ স্থানীয় সংগ্রহকেন্দ্রে বিক্রি করা হয়।
তিনি জানান, প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৮০ লিটার দুধ বিক্রি করে মাসে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। গরুর খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য খাতে মাসে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসিক গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা লাভ থাকে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী গরু বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় হয়।
সুফিয়া জামান জানান, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি দুধ দোহনের মেশিনসহ বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম পেয়েছেন। এসব সহায়তায় খামার পরিচালনা সহজ হয়েছে এবং উৎপাদনও বেড়েছে। পরিবারে এক ছেলে ও এক মেয়েসহ চার সদস্যের সংসার। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী নিজেরাই খামারের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ভবিষ্যতে খামার আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে সুফিয়া জামান বলেন, "কোনো কাজকে ছোট মনে করা উচিত নয়। অল্প পুঁজি দিয়েও শুরু করা যায়। ধৈর্য, পরিশ্রম ও সঠিক পরিচর্যা থাকলে অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব।"
বোচাগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রুমানা আক্তার বলেন, "সুফিয়া জামান বোচাগঞ্জ উপজেলার একজন সফল নারী খামারি। প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি একটি লাভজনক খামার গড়ে তুলেছেন। তিনি শুধু নিজের পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নই করেননি, অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।"
তিনি আরও বলেন, "দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিসম্পদ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদান ক্রমেই বাড়ছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে, যাতে আরও বেশি নারী এ খাতে এগিয়ে আসতে পারেন।"
প্রতিবেশী আসাদ আলী বলেন, "সুফিয়া জামানকে ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ হিসেবে দেখেছি। শুরুতে অনেকেই তার উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ করলেও তিনি থেমে যাননি। আজ তার সফলতা আমাদের এলাকার গর্ব। তার খামার দেখে অনেকেই গরু পালন ও খামার গড়তে আগ্রহী হচ্ছেন।"
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution