প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২১, ২০২৬, ৫:২৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ২০, ২০২৬, ৮:০০ পি.এম

যে বয়সে হাসি বন্ধুদের সাথে খেলায় মগ্ন থেকে বই-খাতা কাঁধে নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা , সেই বয়সেই হাসপাতালের বিছানায় প্রাণঘাতী ব্লাড ক্যান্সারের সঙ্গে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছে সাত বছরের শিশু নুসরাত সাদিয়া খুশি। গত দেড় বছর ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে সে। প্রতিটি দিন যেন তার পরিবারের জন্য নতুন এক সংগ্রামের অধ্যায় । যেখানে পারিবারিক নিত্য দিনের ব্যয় বহন করাই কষ্টসাধ্য, সেখানে দীর্ঘদিনের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে দরিদ্র পরিবারটি।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ধামুর বোল্লারপাড় গ্রামের দিনমজুর এরশাদ হোসেন ও গৃহিণী ছাবিনা ইয়াসমিন দম্পতির মেয়ে নুসরাত সাদিয়া খুশি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা এরশাদ হোসেন। প্রতিদিন কাজ পেলে সংসারে দুমুঠো খাবার জোটে, আর কাজ না থাকলে না খেয়েই কাটে দিন। এমন করেই চলছিল অভাবের সংসার ও সেই চিরচেনা অভাবের মাঝেই স্বপ্ন ছিল একমাত্র মেয়েকে মানুষ করার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ ব্লাড ক্যান্সারের নির্মম বাস্তবতায় থমকে দাঁড়িয়েছে ।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে খুশির শরীরে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, সে অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া (বি-সেল), অর্থাৎ এক ধরনের ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর থেকেই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকদের মতে, এ রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অর্থাভাবে চিকিৎসা ব্যাহত হলে শিশুটির জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মেয়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটির যা কিছু সম্বল ছিল, সবই শেষ হয়ে গেছে। সংসারের গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করেছেন বাবা। এরপর আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে কোনো রকমে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন ঋণের বোঝা ভারি হওয়ায় আত্মীয় স্বজনেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ঋণগ্রস্ত পিতা নিরুপায়, চালতে হবে একমাত্র মেয়ের চিকিৎসার খরচ, যা এখন তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে বাবা এরশাদ হোসেন বলেন, "আমি একজন দিনমজুর। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করলে যা পাই, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। কিন্তু আমার মেয়ের অসুখ ধরা পড়ার পর সবকিছু বদলে গেছে। ওকে বাঁচানোর জন্য সংসারের গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি যা ছিল সব বিক্রি করেছি। আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত মানুষ, যার কাছে পেয়েছি হাত পেতে টাকা ধার নিয়েছি। এখন আর কেউ ধার দিতেও চায় না। হাসপাতালের বেডে আমার মেয়েটা যখন কষ্টে ছটফট করে, তখন একজন বাবা হয়ে শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, যদি টাকা থাকত, তাহলে হয়তো আরও ভালো চিকিৎসা করাতে পারতাম। আমি শুধু আমার মেয়েটার জীবনের জন্য মানুষের একটু সহযোগিতা চাই।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা ছাবিনা ইয়াসমিন বলেন,আমার খুশিটা আগে সারাদিন দৌড়ে বেড়াত, খেলাধুলা করত, হাসত। কিন্তু এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, কষ্টে ছটফট করে । ও যখন বলে, 'মা, আমি বাড়ি যাব', তখন আমার বুকটা ভেঙে যায়। আমি কিছুই করতে পারি না। ওর কষ্ট দেখে মনে হয়, যদি আমার জীবন দিয়ে ওকে সুস্থ করা যেত, তাহলে এক মুহূর্তও ভাবতাম না। একজন মা হয়ে নিজের সন্তানের যন্ত্রণা দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্টের বিসয় । অনেক রাত আমি ওর মাথার পাশে বসে শুধু কান্না করি আর আল্লাহর কাছে দোয়া করি আমার মেয়েটাকে যেন সুস্থ করে দেন। আমি বিত্তবানদের অনুরোধ জানাই, আপনারা আমার মেয়ের পাশে দাঁড়ালে হয়তো আমার মেয়েটা আবার আগের মতো হাসতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দা চাঁন মিয়া বলেন, পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। খুশির চিকিৎসা করাতে গিয়ে তারা একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে শিশুটি নতুন জীবন ফিরে পেতে পারে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন রক্ষায় মানবিক দায়িত্ব থেকে সকলের এগিয়ে আসা উচিত। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করলে পরিবারটির কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে এবং শিশুটির চিকিৎসা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
বর্তমানে নুসরাত সাদিয়া খুশির চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সমাজের বিত্তবান , জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও দেশের মানবিক ও হৃদয়বান মানুষগুলোর কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছে পরিবারটি। তাদের বিশ্বাস, সকলের আর্থিক, আন্তরিক সহায়তা ও দোয়ায় ছোট্ট খুশি আবারও সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে এবং অন্য শিশুদের মতো হাসিমুখে স্কুলে যেতে পারবে।