
দিনাজপুরের হিলি সরকারি খাদ্য গুদামে চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও সিন্ডিকেট প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। ফলে কৃষক তালিকায় নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল নাম্বারের অসংগতি, তালিকাভুক্ত কৃষকদের ধান জমা দিতে না পারা এবং এক জনের মোবাইল নম্বর একাধিক কৃষকের নামে ব্যবহারের ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে হিলি এলএসডি খাদ্য গুদামে ২৬৬ জন কৃষকের কাছ থেকে মোট ৫৩২ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ ধানের মূল্য ছিল ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত কৃষকদের একটি বড়ো অংশ সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহের সুযোগ পাননি। বরং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো কৃষক তালিকা নিয়ন্ত্রণ করে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। তালিকায় অনেক কৃষক নামমাত্র থাকলেও তাদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিরা ধান সরবরাহ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কৃষকদের প্রশ্ন, কৃষক তালিকা তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই এবং ব্যাংক হিসাব খোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব কাজ হয়েছে, নাকি কোনো সিন্ডিকেট চক্রের হস্তক্ষেপে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনুসন্ধানে কৃষক তালিকার বেশ কয়েকটি অসঙ্গতি সামনে আসে। তালিকায় থাকা কৃষক জাকারিয়ার মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভকারী ব্যক্তি নিজেকে মুন্না পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি জাকারিয়া নই। আমার ফোন নাম্বার এখানে কীভাবে এসেছে, সেটাই বুঝতে পারছি না। তালিকায় থাকা কৃষক তৌহিদ হাসান জানান, আমি ধান দেইনি, তবে আমার ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে চকচকা আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক গোলাম রাব্বানী গুদামে ধান দিয়েছে। আমি ধান দেওয়ার সুযোগ পাইনি।
একইভাবে কৃষক তালিকায় থাকা ইমামুল ইসলাম জানান, তার নাম তালিকায় থাকলেও তিনি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করতে পারেননি। তিনি বলেন, অনেক চেষ্টা করেও ধান দেওয়ার সুযোগ পাইনি। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় আমিনুল ইসলামের মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করলে। ফোন রিসিভকারী ব্যক্তি নিজেকে সাখাওয়াত হোসেন হিসেবে পরিচয় দেন। অথচ কৃষক তালিকায় সাখাওয়াত হোসেনের নামও আলাদাভাবে রয়েছে। ফলে একই ব্যক্তির নাম্বার একাধিক কৃষকের নামে ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছে।
তালিকাভুক্ত কৃষক আবুল কাসেম মণ্ডলের কাছে ধান দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ৩ টন ধান গুদামে সরবরাহ করেছি বলে ফোন রেখে দেন। এর কিছু পর তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার থেকে সাখাওয়াত হোসেন নামে এক ব্যক্তি কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করেই ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিককে ফোনে অশ্লীল ভাষা ব্যক্ত করেন এবং হুমকি প্রদান করেন। এদিকে তালিকাভুক্ত একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, তারা সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাননি। অনেকেই দাবি করেছেন, তাদের নাম ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তিরা ধান সরবরাহ করে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করেছেন। ফলে প্রকৃত কৃষকেরা ধান সরবরাহ করতে পারেনি এবং সরকারের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
হিলি সরকারি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাজেদুর রহমান গণমাধ্যমকর্মীকে মুঠোফোনে বলেন, আমি বর্তমানে দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও যাচ্ছি। বৃহস্পতিবার অফিসে এসে বিষয়টি নিয়ে বসব এবং অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখব। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দেওয়ান মো. আতিকুর রহমান বলেন, কৃষক তালিকা যাচাই-বাছাই করে যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জর্জ মিত্র চাকমা বলেন, কৃষক তালিকায় কিছু অসংগতির বিষয় নজরে এসেছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মীকে বলেন, কৃষক তালিকা কৃষি বিভাগ প্রস্তুত করে দিয়েছে। আমরা ব্যক্তিগত ভাবে কৃষকদের চিনি না। যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কৃষকরা ধান সরবরাহ করতে না পারার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি প্রকৃতপক্ষে এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution