

ভারত সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন সেক্টরে চীনের তৈরি বিপুলসংখ্যক এসএইচ-১৫ (SH-15) স্বয়ংক্রিয় কামান মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। বিষয়টি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু নতুন একটি অস্ত্র মোতায়েনের ঘটনা নয়; বরং বেইজিং-ইসলামাবাদ সামরিক সহযোগিতার ক্রমবর্ধমান গভীরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান ভারতমুখী বিভিন্ন সেক্টরে প্রায় ২৫০টি চীনা তৈরি এসএইচ-১৫ স্বয়ংক্রিয় কামান মোতায়েন করেছে। এই তথ্য সঠিক হলে, এটি গত এক দশকে পাকিস্তানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কেন এটি পাকিস্তানের জন্য বড় অগ্রগতি
চুক্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থাও ছিল। এর ফলে পাকিস্তানের ‘হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ ট্যাক্সিলায়’ স্থানীয়ভাবে এসব স্বয়ংক্রিয় কামান সংযোজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের লক্ষ্য শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনা নয়; বরং ধীরে ধীরে নিজস্ব উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা। প্রায় ২৫০টি এসএইচ-১৫ এরই মধ্যে মোতায়েনের খবর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তানের একাধিক আর্টিলারি রেজিমেন্ট এখন এই নতুন ব্যবস্থায় সজ্জিত।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধাস্ত্র পাকিস্তানের পুরোনো কামান ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল ও কার্যকর। এটি একটি ৬*৬ শানসি (Shaanxi) সাঁজোয়া ট্রাক চ্যাসিসে স্থাপন করা হয়েছে, যা দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে গিয়ে গুলি ছোড়া ও সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান পরিবর্তনের (Shoot-and-Scoot) সুযোগ দেয়। ফলে পাল্টা গোলাবর্ষণের ঝুঁকি কমে যায়।
এই কামান যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ‘ন্যাটো’ মানের ১৫৫ মিমি গোলাবারুদ ব্যবহার করতে পারে। প্রচলিত গোলাবারুদ দিয়ে এর পাল্লা ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত। আর দীর্ঘপাল্লার বিশেষ প্রজেক্টাইল ব্যবহার করলে ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে আঘাত হানতে সক্ষম।
কোথায় মোতায়েন করা হয়েছে
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসএইচ-১৫ মোতায়েন করা হয়েছে পাকিস্তানের গুজরানওয়ালা, শিয়ালকোট ও জালালপুর জাট্টান-এর মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। এসব এলাকা ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ শাকরগড় বাল্জ (Shakargarh Bulge) অঞ্চলের দিকে নজর রাখে।
ভারতের জন্য এর অর্থ কী
বিশ্লেষকদের মতে, এসএইচ-১৫ মোতায়েন ভারতের সঙ্গে সামরিক ভারসাম্য মৌলিকভাবে বদলে দিচ্ছে না। তবে এটি পাকিস্তানের প্রচলিত প্রতিরোধক্ষমতাকে ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান রকেট আর্টিলারি ও নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে এসএইচ-১৫ যুক্ত হওয়ায় সংকটের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়সীমা আরও কমে যেতে পারে এবং ভুল হিসাবের কারণে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শুধু কামান নয়, এর পেছনে বড় কৌশল
গত এক দশকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চীন। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের বড় ধরনের অস্ত্র আমদানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এখন চীন থেকে আসে।
তবে এই সম্পর্ক শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন প্রযুক্তি হস্তান্তর, লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদন, প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা, যৌথ সামরিক মহড়া এবং তিন বাহিনীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান আন্তঃকার্যক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বিমান, নৌ ও স্থল- সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে সহযোগিতা
বিমানবাহিনীতে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কর্মসূচি চীন-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি।
এর পাশাপাশি পাকিস্তান যুক্ত করেছে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান, পিএল-১৫ দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, সশস্ত্র ড্রোন ও এইচকিউ-৯/পি ও এলওয়াই-৮০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
নৌবাহিনীতে টাইপ ০৫৪এ/পি ফ্রিগেট ও হাঙ্গর ক্লাস সাবমেরিন কর্মসূচি পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি নৌ সক্ষমতা পুনর্গঠনের অংশ।
অন্যদিকে স্থলবাহিনীতে চীনা ভিটি-৪ ট্যাংক, এসএইচ-১৫ কামান, ক্ষেপণাস্ত্র, হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়া যান ধীরে ধীরে পুরোনো পশ্চিমা সরঞ্জামের জায়গা নিচ্ছে।
চীনের লাভ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, এই অংশীদারত্ব চীনের জন্য একাধিক কৌশলগত সুবিধা এনে দিচ্ছে। পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম সীমান্তে চীনের একটি নির্ভরযোগ্য ভূরাজনৈতিক অংশীদার। একই সঙ্গে এটি চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের বড় বাজার, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-কেন্দ্রিক প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তর ভারত মহাসাগরে প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ ও বাস্তব সামরিক সংঘাতে নিজেদের অস্ত্রের কার্যকারিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে ব্যবহৃত চীনা অস্ত্র থেকে পাওয়া যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আরও উন্নত করতে সহায়তা করছে। এই কারণে অনেক বিশ্লেষক পাকিস্তানকে এখন চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘টেস্ট ল্যাব’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
পাকিস্তানের লাভ
পাকিস্তানের জন্য চীনা অস্ত্র তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল আধুনিকায়নের সুযোগ এনে দিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে সহজ অর্থায়ন এবং পশ্চিমা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ। প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পাকিস্তানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও শক্তিশালী হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution