
বিদ্যুতের নাজুক অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে মুরগির খামার মালিকরা। গরমে হাঁসফাঁস চারপাশ। খামারের ভেতরেও নেই স্বস্তি। বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ রয়েছে ফ্যান। গরমে ছটফট করছে হাজার হাজার মুরগি। কিছুক্ষণ পরপর জেনারেটর চালিয়ে ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন খামারিরা। বিদ্যুৎ ফিরলে জেনারেটর বন্ধ হচ্ছে, আবার লোডশেডিং শুরু হলে সেটি চালু করতে হচ্ছে। এভাবেই কাটছে দিনের পর দিন। লাভের আশায় খামার করে জ¦ালানির বাড়তি খরচ সামলানোর যুদ্ধ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এভাবে উৎপাদনে উচ্চ ব্যয় ও মুনাফা না থাকায় অনেকেই পেশা বদলাচ্ছেন। শুধু খামারিই নয়, সাধারণ মানুষও হাঁসফাঁস করছে বিদ্যুতের নাজুক অবস্থায়। দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। গ্রামীণ এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের অবস্থা আরও নাজুক।
কেবল জেনারেটর নয়, বিদ্যুৎ বিলও এখন খামারিদের জন্য বড় ব্যয়ের খাত।
গত দুই মাসে, অর্থাৎ জুন ও জুলাইয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলে মাথায় হাত পড়েছে খামারিদের। একদিকে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সে ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে ডিজেল দিয়ে। এতে উৎপাদন খরচের ওপর পড়ছে দ্বিমুখী চাপ। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যমতে, গত শনিবার সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে (৭টা) দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় ২ হাজার ৬৫৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ৫৩৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল ঢাকা জোনে। এরপর ৪৮৬ মেগাওয়াট ছিল ময়মনসিংহ জোনে। আগের দিন শুক্রবার একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৪২ মেগাওয়াট। একইভাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে সারা দেশে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। ওই সময় ১ হাজার ৪০৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। পরিস্থিতির উন্নতি তো নয়ই, বরং ক্রমান্বয়ে সেই লোডশেডিংয়ের মাত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিনতিতে লাটে উঠছে সব ব্যবসা-বাণিজ্যও।
অসহ্য গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার কারণে গ্রাহকদের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে গড়ে অর্ধেক দিন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজকর্ম। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বলছে, রংপুরসহ উত্তরের ১৭ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক প্রায় এক কোটি।
চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এছাড়া প্রায়ই বৈদ্যুতিক লাইনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। এসব কারণে ঠিকমত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছেনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় গড়ে ৫ থেকে ৭ লাখ পর্যন্ত গ্রাহক রয়েছে। বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে ৮ থেকে ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি। প্রত্যেক সমিতিতে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ৭০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। কিন্তু চাহিদার তুলনায় আনেক কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে সমিতিগুলো। প্রতিদিন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে অন্তত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। খোঁজ নিয়ে জানান যায়, রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতায় গ্রাহক রয়েছে ৬ লাখের ওপর। এই সমিতিতে প্রতিদিনের চাহিদা ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু বর্তমানে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। একই অবস্থা বিরাজ করছে উত্তরের ১৭টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির।
তাপদাহের ধকলের সঙ্গে অসহনীয় লোডশেডিংয়ে অস্বস্তি আরও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে বয়স্ক ও শিশুদের। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং বন্ধ করাসহ সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানান। গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গ্রাহকের কাছে ইচ্ছেমত বিল আদায় করছে। মিটার ভাড়া ও ডিমার্ড চার্জ নিচ্ছে, যা একেবারেই অযৌক্তিক। অথচ সেবার মান নেই। রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতায় মিঠাপুকুর উপজেলার গ্রাহক হাবিবুর রহমান ও সবুজ আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করেন, একদিকে গরম আর অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুতের ঘন ঘন যাওয়া-আসা। এতে আমরা গ্রাহকরা অতিষ্ঠ। বার বার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো প্রতিকার পাইনি।
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর গঙ্গাচড়া জোনাল অফিসের আওতায় রংপুর নগরীর বুড়িরহাট এলাকার গ্রাহক আলবেদা খাতুন অভিযোগ করেন, শনিবার সকাল ৭টা থেকে রবিবার সকাল ৭টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় অন্তত ১০ দফায় লোডশেডিং হয়েছে। রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফায় লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। ওই সময় ৩০ মিনিট পর বিদ্যুত চলে যায়, আতে তিন ঘন্টা পর। তালুক হাবু গ্রামের আহাদ আলী জানান, গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ বার লোডশেডিং হচ্ছে। গড়ে অর্ধেক দিনই বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে। এতে ফ্রিজসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, এখানে আকাশে মেঘ করলেই বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রত্যেক সপ্তাহে অন্তত একদিন লাইনের কাজের অজুহাতে মাইকিং করে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘোষণা ছাড়াও একদিন সংযোগ থাকেনা। বাকি পাঁচদিন ভর করে লোডশেডিং। তবে গঙ্গাচড়া জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ফরহাদ হোসেন বিষয়টি অস্বীকার করে বললেন, মুলত গ্রাহকদের সুবিধার্থে লাইনের ত্রুটি সারতেই ঘোষণা দিয়ে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে তো আমাদের কিছুই করার নেই। বর্তমানে ১৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলছে বলেও জানান তিনি।
সার্বিক বিষয় জানতে যোগাযোগ করা হলে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মনোয়ারুল ইসলাম ফিরোজী’র ভাষ্য, ১০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলছে ৬০ মেগাওয়াট। সে কারণে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের যোগান না থাকায় গ্রাহকদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, আমরাও অসহায়। বরাদ্দ ঠিকমতো পেলে গ্রাহকের আর সমস্যা থাকবে না। তবে লোডশেডিং কমিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। এছাড়াও প্রায়ই বৈদ্যুতিক লাইনে ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে দাবি করে তিনি জানান, উত্তরের ১৭ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতেই এমন অবস্থা বিরাজ করছে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution