আজ সেই মন্দির নি¯প্রাণ। অযত্ন অবহেলায় গাছ-গাছালীতে আচ্ছন্ন। অপরিচ্ছন্ন ঘরে প্রতিমার স্থান দখল করে ফেলেছে সর্পকূল। শুধু এই সাপের ভয়েই কেউ মন্দিরে যায় না।
রংপুরের জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৬ কি.মি. দক্ষিণে পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে অবস্থান। এই উপজেলা সদর থেকে ৩ কি.মি. পশ্চিমে আখিরা নদীর ধার ঘেঁষে রায়পুরের জমিদার লাসমন সিং-এর বাড়ী।
লাসমন সিং এর ছিলো ৩ পুত্র। এরা হলেন, মুরালী সিং, বদি সিং ও বীরেন সিং। লাসমন সিং এর মৃত্যুর পর পৈতৃক সূত্রে জমিদারী পেয়ে যান তারা। দেশ বিভাগের পূর্বে মুরালী সিং ও বদি সিং ভারতে চলে যান। এরপর পৈতৃক ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে কনিষ্ঠ পুত্র বীরেন সিং জমিদার বাড়ীতে থেকে যান। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে তিনিও চলে যান ভারতে। লাসমন সিং এর ১৯’শ বিঘা জমি পড়ে থাকে পীরগঞ্জ সহ এ উত্তরের জনপদে।
বীরেন সিং-এর কোনো সন্তান ছিলো না। তাই তিনি ভারতে চলে যাবার সময় পূর্ব হতে তাদের জমিদারী দেখাশুনার দায়িত্বে নিয়োজিতদের এই বিশাল সম্পত্তি ও জমিদারী ভিটেমাটি তত্ত্ববধানের জন্য বলে যান। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে দেখাশুনার দায়িত্বে নিয়োজিতরা এই বিশাল সম্পত্তি তাদের তৈরী কাগজপত্রের মাধ্যমে এসব সম্পত্তির মালিক বনে যান। প্রায় ১৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত রায়পুর জমিদার বাড়ী। দেশ স্বাধীনের পর এই জমিদার বাড়ীর ভিটে টুকুও দখল করে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয় বীরেন সিং এর জমিদার বাড়ী সহ ৫ একর জমি প্রাপ্ত হয়। এরপর ‘‘জোর যার মুল্লুক'’ এই প্রক্রিয়ায় জমিদার বাড়ীর বাদ বাকী জমি বেদখল হয়ে যায়। বিজ্ঞজনদের মতে রায়পুরের জমিদার লাসমন সিং এর ১৯’শ বিঘা সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাওয়ার কাহিনী এক রহস্যজনক অধ্যায়। তাদের মতে আজও এই বেদখলকৃত জমি উদ্ধারে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করলে প্রতি বছর ওই বেহাত হওয়া জমিদারী সম্পত্তি থেকে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব।
অন্যদিকে ওই সম্পত্তির উপর গড়ে উঠতে পারে সরকারের নেয়া বিশাল বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প, জাতীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান। পীরগঞ্জের এক সময়ের প্রতাবশালী জমিদার বীরেন বাবুর সুবিশাল জমিদারী এলাকা ও মনোরম প্রসাদ ছেড়ে ভারতে চলে যান প্রায় এক‘শ বছর আগে। আখিরা নদীর তীরবতী জমিদার বাড়ী ও বেশ কিছু সম্পতি তিনি দান করে যান রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। সে থেকে পরিত্যক্ত আছে বীরেন বাবুর জমিদার বাড়ী। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তাতে যত্নের ছোয়া লাগেনি একটুও। বর্তমানে জমিদার বাড়ীর ইট খসে ভেঙ্গেচুরে এক ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে চলেছে ঐতিহাসিক অমুল্য এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
উপজেলার ৮ নং রায়পুর ইউনিয়নের অন্তর্গত থানা সদর থেকে পশ্চিমে রায়পুরের জমিদার বাড়ীর দুরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। ছোট আখিরা নদীর তীরবর্তী উচু ভিটের উপর প্রায় ৬ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছিল জমিদার বিরেন বাবুর প্রসাদ। প্রসাদের চারদিকে সারি বদ্ধ লম্বা নারিকেল গাছ ও ইট সুরকি দিয়ে নির্মিত আধাপাাকা বিশাল প্রাচীর। আর প্রাচীর সংলগ্ন উল্টো দিকে দু‘টি বড় পুকুর, দক্ষিন পশ্চিম দিকে ছিল জমিদার বিরেন বাবুর বিচারালয়।
এই বিচারালয়ে তিনি নিজে শুধুমাত্র অপারাধীদের একক উপস্থিতিতে বিচারকার্য ও শাস্তি প্রদান করতেন। বিচার কক্ষ থেকে সামনে নেমে গেছে ইট বিছানো ঘাট আখিরা নদীতে। এখানেই শ্লান করতেন জমিদার পরিবারের লোকেরা। পশ্চিম পাশের অতিথিশালা যা কিছুদিন পূর্বেও রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এখন ধ্বসে পড়ার আশংকায় ছাত্ররা আর থাকেনা এখানে। উ্ত্তর কোনে জমিদারের বসার ঘর ও শোবার ঘর ছিল, সেটি ভেঙ্গে ইট সুড়কির স্তুপে পরিণত হয়েছে। বসার ঘরটি স্থানীয় হিন্দু সম্পদায়ের লোকজন পুজোমন্ডপ হিসেবে ব্যবহার করলেও এখন তা ছুচো চামচিকা আর ইঁদুরের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
এসকল ভবনের নির্মাণশৈলী ছিল অত্যান্ত শিল্পকার্য খচিত ও মনোরম। ভবনগুলোর দরজা-জানালাগুলো হয়ত তেমনিই মুল্যবান ছিল। তা চুরি গেছে বেশ কিছুদিন আগেই এখনও চুরি যাচ্ছে ইট-পাথর। জানা গেছে ,পরিত্যক্ত এই জমিদার বাড়ীতে অনেক মুল্যবান মুর্তি, পাথর ও বিভিন্ন প্রকার তৈজস সামগ্রী ছিল।
যত্ন ও সংরক্ষনের অভাবে সেসব খোয়া যাচ্ছে দিনের পর দিন। রায়পুর জমিদার বাড়ীতে বর্তেমানে যেটুকু ধ্বংসাবশেষ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে তা সংরক্ষনের জন্য নেই কোন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা। অথচ ঐ মনোরম স্থানে গড়ে তোলা যেতে পারে অবসর কেন্দ্র, পিকনিক স্পাট। এতে অন্তর্ত আগামী প্রজন্ম ঐতিহাসিক নিদর্শন রায়পুরের জমিদার বীরেন বাবুর জমিদারী ইতিহাস জানতে পারতো।
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আলা বাকীউল বারী বলেন, বিষয়টি আমি গনমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।