তাদের তৎপরতা প্রতিহত করতে সারা দেশে এলাকাভিত্তিক আওয়ামী লীগ নেতাদের তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে তাদের খুঁজে বের করা ও অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হবে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তবে গ্রেফতার এড়াতে দলটির নেতারা এখন জুম ও হোয়াটসঅ্যাপের পরিবর্তে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে টেলিগ্রামে বৈঠক করছেন বলে জানা গেছে।
থানাভিত্তিক তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ
গত কয়েক মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় চিন্তায় পড়েছে প্রশাসন। প্রশাসনে এখনো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া তাদের আস্থাভাজনরা থাকায় তথ্য ফাঁস হচ্ছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় দেশের প্রতিটি থানাকে এলাকাভিত্তিক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও মহিলা লীগের নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই কাজ এখনো চলছে। খুব শিগগির তালিকা তৈরি করে নজরদারির পাশাপাশি গ্রেফতার অভিযানে নামবে পুলিশ।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও ছাত্রলীগের সভাপতিসহ ছয়জনের গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ফাঁসির রায় হয়েছে। এ রায়কে কেন্দ্র করে গত দুই সপ্তাহে অন্তত অর্ধশত ককটেল বিস্ফোরণ ও কয়েকটি বাস পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন, বাইরে থাকা নেতাকর্মীদের দিয়ে দলটি দফায় দফায় নাশকতার ছক আঁকছে। এই অবস্থায় দলটির নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন।
তালিকা তৈরির কাজে থানা পুলিশ, ডিবি ও মাঠপর্যায়ে থাকা গোয়েন্দাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
জানা গেছে, তালিকায় কোনো এলাকার নেতার নাম, পদবি, বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, জমিজমা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি কোন কোন নেতা বিদেশে অবস্থান করে গুটি চালছেন, তা-ও খুঁজে বের করতে মাঠে কাজ করছেন গোয়েন্দারা।
রাইড শেয়ার ও অটোচালকদের ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ
গত জুন থেকে ঢাকায় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠ গরম ও নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে বেশির ভাগ নেতা এখন গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তাদের কেউ কেউ রাইড শেয়ারিং ও অটোরিকশা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছদ্মবেশে রাইড শেয়ারিং ও অটোরিকশা চালাচ্ছেন—এমন তথ্য ইতিমধ্যে পেয়েছেন গোয়েন্দারা। বিষয়টি নিয়েও তারা কাজ করছেন। ঢাকায় সম্প্রতি বাইরের জেলার মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে। এসব মোটরসাইকেল কোন কোন রুটে চলছে, কারা চালাচ্ছেন এবং তারা মিছিলে অংশ নিচ্ছেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
গুলশানের মিছিলের আগে টেলিগ্রামে বৈঠক
সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে হঠাৎ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিছিল প্রশাসনে নাড়াচাড়া তৈরি করেছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, মিছিল শুরুর মাত্র ১০ মিনিট আগে তারা এ বিষয়ে তথ্য পেয়েছিল। কিন্তু তখন তেমন কিছু করার ছিল না। তথ্যটি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানো হবে কি না, তা নিয়েও তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন।
তথ্যটি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানো হলেও তেমন গুরুত্ব পায়নি। দিনের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গুলশান-১ থেকে গুলশান-২ যাওয়ার সড়কে জড়ো হয়ে মিছিল করতে পারেন—এমন ধারণা ছিল না সংশ্লিষ্টদের। ফলে তথ্য পাওয়ার পরও মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
গুলশান পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, মিছিলের মাত্র ১০ মিনিট আগে তথ্য পাওয়ায় থানা থেকে রিজার্ভ ফোর্স পাঠানোর আগেই মিছিল শেষ হয়ে যায়। একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও লোকসংখ্যা বেশি থাকায় তারা তাদের ধরতে পারেনি। বরং পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হন। এর মধ্যেও কয়েকজনকে আটক করা হয়।
পরে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, গুলশানে মিছিলের আগে আশপাশে থাকা নেতাকর্মীদের টেলিগ্রামে বৈঠক করে জড়ো করা হয়। ফলে বিষয়টি আগামভাবে তাদের কাছে পৌঁছায়নি। এ ঘটনার পর গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানা যায়।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা আরও জানিয়েছেন, বিদেশে থাকা নেতারা তাদের টেলিগ্রামে গ্রুপে যুক্ত করেছিলেন। গুলশান, বাড্ডা, গাজীপুর, নর্দা, কুড়িল ও বনানীতে থাকা নেতাকর্মীরা ওই বৈঠকে যুক্ত হয়ে পরে অন্যদের খবর দেন।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যা বলছেন
ঢাকার কয়েকটি বিভাগ ও জোনের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তালিকা করে তাদের ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা বাইরে আছেন, তারা বিভিন্নভাবে মিছিল করে নাশকতার জন্য কাজ করছেন। এসব বিষয়ে নজরদারির পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরির কাজও চলছে।
ডিএমপির কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, গত দুই বছর ধরেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চলছে। এখনো তা চলমান। নতুন করে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। তবে সারা দেশে তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। এটি শেষ হলে তাদের গ্রেফতার, অবস্থান শনাক্ত ও ধরার কাজ সহজ হবে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ক্রাইম অ্যান্ড অপস বিভাগের অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান বলেন, যারা সন্ত্রাস করছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পুলিশ বেকায়দায় পড়বে। ফলে তালিকা করা হচ্ছে। এটি নিয়মিত করতেই হয়। তালিকা তৈরির কাজ চলমান আছে।

