
একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেন না, গড়ে তোলেন শিক্ষার্থীর জীবন, জাগিয়ে তোলেন স্বপ্ন দেখার সাহস। তাঁর শাসন, স্নেহ ও ভালোবাসায় তৈরি হয় অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ। সেই প্রিয় শিক্ষক যখন দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে বিদায় নেন, তখন স্মৃতি আর বিচ্ছেদের বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের হৃদয়।
এমনই এক আবেগঘন পরিবেশে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গীরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজে (১৪ অক্টোবর মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হয়েছে দীর্ঘদিনের প্রিয় শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া স্যারের বিদায় অনুষ্ঠান। ১৯৮৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর দীর্ঘ ৩৭ বছর ১ মাস ১৪ দিনের শিক্ষকতা জীবনে তিনি সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন গভীর আত্মিক সম্পর্ক।
তাঁর বিদায়ে উপস্থিত অনেকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।দিনাজপুর জেলার চিড়িরবন্দর উপজেলার চম্পাতলী গ্রামের হাসিমপুরে জন্ম নেওয়া গোলাম কিবরিয়া শিক্ষকতার টানে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মস্থলে আসতে কখনো বাসে, কখনো পায়ে হেঁটে, আবার কখনো সাইকেলে চড়ে দীর্ঘ ৩০ মাইল পাড়ি দিয়ে এসেছেন এই প্রতিষ্ঠানে । তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের এই অধ্যায় শিক্ষকতার প্রতি নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাঙ্গীরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি ও তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোনাব্বর হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহিনুর ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, কিবরিয়া স্যারের অবদান ও দিকনির্দেশনা তাঁদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান তিনি।
বিদায়ী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত কিবরিয়া স্যার বিদায়ী বক্তব্যে গোলাম কিবরিয়া স্যার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আজকের এই বিদায় আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি।
এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বেঞ্চ ও পরিচিত মুখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। কত শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছি, কতজনকে শাসন করেছি, আবার ভুল করলে বুকে টেনে নিয়ে বুঝিয়েছি—সবকিছু আজ চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
আমার কোনো কথা বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দেবে। সব সময় চেয়েছি, আমার শিক্ষার্থীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, সৎ পথে চলুক এবং পরিবার ও সমাজের মুখ উজ্জ্বল করুক।
আজ আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু মন থেকে কখনো বিদায় নিতে পারব না। সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো, শিক্ষার্থীদের মুখের হাসি আর শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মুহূর্তগুলো আজীবন হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। আপনারা আমাকে ভুলে গেলেও আমি আপনাদের ভুলতে পারব না। আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন জীবনের বাকি দিনগুলো সম্মান ও শান্তির সঙ্গে কাটাতে পারি। আপনাদের ভালোবাসাই আমার শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
তাঁর এমন আবেগঘন বক্তব্যে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে গিয়ে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় বিষাদময় পরিবেশ।দীর্ঘ ৩৭ বছরেরও বেশি সময়ের কর্মজীবন শেষে গোলাম কিবরিয়া স্যার আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেও ডাঙ্গীরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি ও অবদান অমলিন হয়ে থাকবে।
শ্রেণিকক্ষে তাঁর উপস্থিতি হয়তো আর আগের মতো থাকবে না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন প্রিয় শিক্ষক হিসেবে। কারণ, একজন শিক্ষকের প্রকৃত বিদায় কর্মস্থল থেকে হয়, শিক্ষার্থীদের হৃদয় থেকে নয়।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution