প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২১, ২০২৬, ৫:৪৫ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ২১, ২০২৬, ৩:১১ পি.এম

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং একাধিক ফৌজদারি মামলার বিষয়। স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচায় প্রায় ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার লেনদেনের উৎস নিয়ে অর্থপাচারের অভিযোগে করা মামলায় সম্প্রতি তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে জুলাই আন্দোলনের সময় গুলিতে এক আন্দোলনকারী আহত হওয়ার ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় করা মামলাতেও তাঁকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় তাঁকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল বলে পুলিশের একটি আবেদনপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এবং চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে পরিচিত দিলীপ আগরওয়ালার রাজনৈতিক যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার মামলা নম্বর ৫৭, তারিখ ২৭ মার্চ ২০২৫। এ মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩০৭, ৩২৬, ১০৯ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহারে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ৩১ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে বাদীও আন্দোলনে অংশ নেন। পরে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিএনএস সেন্টারের পশ্চিম পাশে অবস্থান নেন।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে এজাহারনামীয় কয়েকজন আসামির নির্দেশে দিলীপ আগরওয়ালাসহ অন্য আসামিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বেআইনি জনতাবদ্ধে সশস্ত্র হামলা চালান এবং আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এতে বাদীর কোমরের ওপরের অংশে, মেরুদণ্ডের নিচের দিকে গুলি লাগে। তিনি ঘটনাস্থলে অচেতন হয়ে পড়লে সহ-আন্দোলনকারীরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
পুলিশের আবেদনে আরও বলা হয়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বাদী দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে থানায় অভিযোগ করলে মামলাটি নথিভুক্ত হয়।
উত্তরা পশ্চিম থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. সুমন মিয়া আদালতে দাখিল করা আবেদনে দিলীপ আগরওয়ালাকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, দিলীপ আগরওয়ালা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন এবং চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে সংসদ সদস্য পদে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। মামলার ঘটনাস্থলে তাঁর উপস্থিতি এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার দাবি করে পুলিশ।
মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, তাঁদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ এবং ঘটনার সময় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দিলীপ আগরওয়ালাকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনার আরেকটি বড় অংশ হলো ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বর্ণ ও হীরার কেনাবেচা এবং অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুলশান অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম ও কার্যালয়কে কেন্দ্র করে অপরাধ সংঘটিত হয়।
সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া ব্যাংক হিসাব, নথিপত্র এবং জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে এজাহারে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বৈধভাবে ঋণপত্র বা এলসির মাধ্যমে বিদেশ থেকে ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ১১ টাকা ৫২ পয়সার স্বর্ণবার, স্বর্ণালংকার, লুজ ডায়মন্ড ও অন্যান্য অলংকার আমদানি করেছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার স্বর্ণ ও হীরা কিনেছে, বিনিময় করেছে বা রূপান্তর করেছে বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
সিআইডির অভিযোগ, স্থানীয় বাজার থেকে কেনা এসব স্বর্ণ ও হীরার বিক্রেতা এবং পণ্যের মূল উৎস সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বৈধ নথিপত্র তদন্ত কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করা যায়নি। তদন্ত সংস্থার ধারণা, এসব পণ্যের একটি অংশ চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে এসে থাকতে পারে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর গুলশান থানায় মামলাটি করেন সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শেখ।
গত ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন ২০ অক্টোবর তাঁকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।
অর্থপাচারের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আশরাফুল হাসান তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের আদালত তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে মামলার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা এবং অর্থপাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দেয় এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন।
আদালতের আদেশের পর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা স্বর্ণ ও হীরার উৎস, সরবরাহকারীদের পরিচয়, লেনদেনের অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের যথার্থতা।
দিলীপ আগরওয়ালাকে এর আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার বাড্ডায় কিশোর হৃদয় আহমেদ হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং ওই মামলায় তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে তাঁকে আরও কয়েকটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি জামিন পান এবং ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
ব্যবসায়ী পরিচয়ের পাশাপাশি দিলীপ আগরওয়ালা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। ২০২৩ সালে গঠিত দলটির উপকমিটিতে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ওই বছরের নভেম্বরে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় আসে।
দলীয় উপকমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তি এবং রাজনৈতিক পরিচিতি তাঁর সাংগঠনিক যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরে। তবে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার মাত্রা কিংবা এই যোগাযোগের ফলে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে চলছে অনুসন্ধান।
দিলীপ আগরওয়ালার ব্যবসা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক ও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে আসল হীরার নামে অন্য পাথর বিক্রি এবং আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়ও রয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল।
দিলীপ আগরওয়ালার রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক অনুসন্ধানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে রয়েছে। আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া কী ছিল? দলীয় পদ পাওয়ার পর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কোনো বিশেষ সুবিধা তৈরি হয়েছিল কি না? সরকারি সংস্থা, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া, শুল্ক ব্যবস্থাপনা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো প্রভাব পড়েছিল কি না?
সব মিলিয়ে, দিলীপ আগরওয়ালাকে ঘিরে দুটি পৃথক তদন্তের বিষয় সামনে এসেছে—একটি জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলা, অন্যটি স্বর্ণ-হীরা কেনাবেচা ও অর্থপাচারের অভিযোগ। দুটি মামলাতেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো অনিয়মের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে প্রামাণ্য নথি, তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।