জানা যায়, গঙ্গাচড়া উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়ন তিস্তা নদী কবলিত। এসব ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষ নদীভাঙন, বন্যা ও কর্মসংস্থানের সংকটে ভুগছেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় নারীদের জীবিকার সুযোগ সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি প্রকল্পের আওতায় সৃষ্ট কর্মসংস্থান তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অবস্থা সাপেক্ষে তাদেরকেই অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন ছিল।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে গত ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ইউনিয়নে ১০ জন করে নারী কর্মী নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের বয়স ২৫ বছরের বেশি ও ৪৫ বছরের কম, ভূমিহীন অথবা শূন্য দশমিক ৫ একরের কম জমির মালিক এবং শারীরিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দরিদ্র, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও পরিবারপ্রধান নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিস্তা নদী কবলিত চরাঞ্চলের মিনার বাজার গ্রামের আয়শা খাতুন বলেন, আমরা চরাঞ্চলের মানুষ, সারা বছর অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকি। আমাদের মতো অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে সরকার প্রকল্প চালু করেছে। অথচ আমরা সেই সুযোগই পেলাম না। চরাঞ্চলে পাকা রাস্তা নেই বলে যদি আমাদের নিয়োগ দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা কীভাবে বাঁচব? আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই? সরকারি প্রকল্পে আমাদেরও সমান অধিকার রয়েছে। নিয়োগের নামে আমাদের বঞ্চিত করা হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই বৈষম্যের সুষ্ঠু তদন্ত ও পুনরায় নিয়োগ চাই।
নোহালী ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহানা খাতুন বলেন, ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র দুটি ওয়ার্ডে মাইকিং করা হয়েছে। ফলে অনেকেই নিয়োগের বিষয়ে জানতে পারেননি। প্রচারে বয়সসীমা ২৫ থেকে ৪০ বছর বলা হলেও বিজ্ঞপ্তিতে ৪৫ বছর পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ ছিল। এতে অনেক যোগ্য নারী অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
একই ইউনিয়নের বাসিন্দা মজিদা বেগম বলেন, নারী কর্মী নিয়োগে সব ওয়ার্ডে সমানভাবে প্রচার করা উচিত ছিল। লটারিতে ১০ জনের মধ্যে একই ওয়ার্ডের চারজন নির্বাচিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীরা নিয়োগের সুযোগ পেয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রেজাউল হক বলেন, আমি নারী কর্মী নিয়োগের বিষয়ে অবগত ছিলাম না। ইউনিয়নের সব ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধিদের অবগত করে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত ছিল।
চরাঞ্চলের নারীদের নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়ে নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, চরাঞ্চলে পাকা রাস্তা নেই। এ কারণে চরাঞ্চলের নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
নিয়োগ কার্যক্রমে উপসহকারী প্রকৌশলী মামুন মিয়া, কমিউনিটি অর্গানাইজার মো. ফিরোজ মামুন এবং উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মো. পারভেজ মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে সার্ভেয়ার মো. পারভেজ মাহমুদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা প্রকৌশলী জয়া স্যানাল বলেন, তাঁদের পরিপত্রে চরাঞ্চলের নারীদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে উল্লেখ নেই। ওই এলাকায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সড়ক নেই। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তাবলিতে চরাঞ্চলের নারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকার কথা জানিয়ে এ সিদ্ধান্তের ভিত্তি জানতে চাইলে তিনি পরে অফিসে গিয়ে কথা বলার অনুরোধ জানান।
তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তাবলিতে চরাঞ্চলের নারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় পাকা সড়ক না থাকার কারণ দেখিয়ে তাঁদের নিয়োগের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত কোন নীতিমালা বা নির্দেশনার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, নারী কর্মী নিয়োগের বিষয়টি এলজিইডি দেখভাল করে। এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত করা হবে।