প্রিন্ট এর তারিখঃ নভেম্বর ৭, ২০২৬, ১:৩২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ নভেম্বর ৭, ২০২৬, ১০:৩৫ এ.এম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকে না; সময়ের সীমানা পেরিয়ে সেসব দিন জাতির রাজনৈতিক গতিপথের সঙ্গে মিশে যায়। ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। ১৯৭৫ সালের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রাজনীতিতে তার দীর্ঘ প্রভাব পড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিএনপি ও এর সমর্থকদের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ এক গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এরই মধ্যে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোয় এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।
এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের অভ্যুত্থান শুরু হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা ছিল তাদের অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ। পরে সিপাহিরা ট্যাংক নিয়ে ঢাকার রাজপথে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটি অংশও রাস্তায় নেমে আসে। ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ এবং ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব জিন্দাবাদ’—এসব স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হয়ে ওঠে।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমান আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্বে পুনর্বহাল হন এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে জিয়াউর রহমান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা গ্রহণ করেন।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের সুযোগ বিস্তৃত হয় এবং দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা ঘটে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ৭ নভেম্বরকে বিএনপি ও এর সমর্থকেরা রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সময়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের ভিত্তি স্থাপন, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং খাল খননের মতো কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীরা মনে করেন।
তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তখন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত এবং ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের একপর্যায়ে বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিভিন্ন ছাত্র সংসদে সাফল্যও সেই আন্দোলনকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে। একপর্যায়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে। এই দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট সেখানেই থেমে থাকেনি। ২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।
এই সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুখ হিসেবে সামনে আসেন তারেক রহমান। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর তাঁর নেতৃত্বকে বিএনপি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার পরবর্তী অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরে। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বিএনপির আন্দোলন আরও তীব্র হয়। দলটির দাবি অনুযায়ী, তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করতে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে দিকনির্দেশনা দিতে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি এবং তাঁর পরিবারকে চাপের মুখে রাখার অভিযোগও বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে সেই রাজনৈতিক আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমে বৈষম্যবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হয়। একপর্যায়ে ছাত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। আন্দোলনকে ঘিরে সংঘাত, প্রাণহানি এবং সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে।
বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে এই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দিকনির্দেশনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দলটির মতে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের দাবির ধারাবাহিকতায় এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। বিদেশে অবস্থান করেও তারেক রহমান নেতা-কর্মী ও আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়।
এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে বিএনপি জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ভূমিকা, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছুকে একই ধারার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বহুদলীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভূমিকা সামনে আসে। আর তারেক রহমানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের এই ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি বিএনপি ও দলটির সমর্থকদের কাছে এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। তাঁদের দৃষ্টিতে, দেশের সংকটময় প্রতিটি পর্যায়ে জিয়া পরিবারের সদস্যরা জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাই ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ভূমিকার কথাও সামনে আসে। ৭ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমাকে বিএনপি জিয়া পরিবারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করে।