
মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পঞ্চম ধাপের গাইবান্ধায় চলমান। জেলার সদর উপজেলায় ৪৬ টি ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। খাসজমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে আরও ঘর। এ প্রকল্পের আওতায় সদর উপজেলার খোলাহাটী ইউনিয়নের আনালেরতাড়ি এলাকায় ৪৩ টি ঘর নির্মাণ কাজ চলছে। এসব ঘরের নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্মিত অনেক ঘরের মেঝে ও গাঁথুনি ভেঙে গেছে। প্রকৌশলী জুবায়ের হোসেনের গাফলতির কারণে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা পর্যায়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে একটি কমিটি। এ কমিটির সদস্যসচিব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)। কমিটিতে অন্যদের মধ্যে আছেন ইউএনও, উপজেলা প্রকৌশলী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালি, রামচন্দ্রপুর, লক্ষীপুর, কামারজানি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম এলাকায় এসব ঘর নির্মাণ করা হয়। সেগুলো গৃহহীনদের মধ্যে হস্তান্তরও করা হয়েছে। নতুন করে উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের আনালেরতাড়ি (হাতিয়ার বিল) গ্রামে ৪৩ টি ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫টি ঘর তৈরির কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। এখন সেখানে মেঝে পাঁকা, বারান্দা, বিদ্যুতের সংযোগ ও রঙের কাজ বাকি রয়েছে। পাশেই নতুন করে আরও ১৮ টি ঘর তৈরির কাজ চলমান। প্রতিটি ঘরের আয়তন দৈর্ঘ্য ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চি, প্রস্থ ২২ ফুট ৩ ইঞ্চি। সঙ্গে থাকবে রান্নাঘর ও শৌচাগার। প্রতিটি ১০ ঘরের জন্য একটি নলকূপ। ঘরপ্রতি বরাদ্দ ৩ লাখ টাকা করে। ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত এ ঘরগুলো রঙিন টিনের দুই কামরার হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, কাগজ কলমে ঘর নির্মাণের কমিটি গঠন হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘরগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা ছিল। ফলে ঘরের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে গিয়ে কাজের মান ঠিক থাকছে না। আশ্রয়ণ ঘর যেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে যেতে কাঁদা ও হাটু পানি মাড়িয়ে যেতে হয়। এতে সংযোগ রাস্তা না থাকায় ওই এলাকায় দেখভাল করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী নিয়মিত আসে না বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। রাজমিস্ত্রী বেলাল মিয়া একই উপজেলার বাসিন্দা। তিনি রাজমিস্ত্রীর পাশাপাশি ঠিকাদারির কাজও করেন। ঘর নির্মাণকাজ কমিটির সরাসরি করার কথা থাকলেও কাজ দেওয়া হয়েছে বেলাল মিয়াকে। তিনি ঠিকাদারের মতো করে কাজ করছেন। ইঞ্জিনিয়ার জোবায়ের যোগসাজসে নিম্ন মানের কাজ হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আনালেরতাড়ি এলাকার হাতিয়ার বিলের মরাঘাটি সড়কের পাশে ৪৩ টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। নির্মাণ কাজ দেখতে যেতে কাঁদা ও হাটু পানি পেরিয়ে যেতে হয়। ঘরগুলোর চারপাশে আমনধানের ক্ষেত। ঘর গাঁথুনির জন্য কয়েক হাজার ইট আনা হয়েছে, যেগুলোর মান খুবই নিম্নমানের। ইট নিম্নমানের হওয়ায় স্থানীয় লোকজন কয়েক দফায় কাজ বন্ধ দিয়েছিলেন। এলোমেলো ভাবে ইট গুলো রাখা হয়েছে। ইট ব্যবসায়ীদের ভাষায়, এগুলো ‘২ নম্বর’ ইট। ঘরে ইটের গাঁথুনির জন্য যে বালুসিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, তাও নিম্নমানের। ঢালাইয়ে এক বস্তা সিমেন্টের সঙ্গে যে পরিমাণ বালু দেওয়ার কথা, তার চেয়ে বেশি বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে হালকা ধাক্কাতেই ইটের গাঁথুনি খুলে যাচ্ছে। ঘরের ভিত তৈরির জন্য গর্ত করা হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় কম। প্রায় কাজেই নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সিমেন্ট মেশানো হয়েছে। এতে ঢালাইসহ ইটগুলো মাটির মতো খসে পড়ছে। ঘরের চালায় নির্ধারিত পরিমাপের চেয়ে চিকন কাঠ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অনেক ঘরের লিংটন ঢালাইয়ের সময় দেওয়া রডও বের হয়ে আছে। রড গুলোতে মরিচা ধরছে। কিছু ঘরের গাঁথুনি ভেঙে পড়ে গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘর নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত একজন রাজমিস্ত্রি বলেন, “এখানে কাজ করার জন্য যে ইট আনা হয়েছে সেগুলো দিয়ে মানুষ রাস্তাও বানায় না। ইট গুলো হাতে নিয়ে ছেড়ে দিলে মাটিতে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে। সঠিক পরিমাপে সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে না। হেড মিস্ত্রী ঘর নির্মাণের ঠিকাদারি নিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার স্যার শুধু তার কাছে ফোন করে, এখানে আসেন না”।
হেড মিস্ত্রী বেলাল মিয়া বলেন, “ইট গুলো নাকি ভালো মানের নয়। তাই স্থানীয় ব্যক্তিরা কাজ বন্ধ করেছেন। আমি বড় স্যারকে ইটের বিষয়টি জানিয়েছি। আমি এখানে চুক্তি ভিত্তিক ঘরের কাজগুলো নিয়েছি। যে ভাবে করতে বলবে, আমি সেভাবেই কাজ করে দিবো। ঢালাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, কম সিমেন্ট হলে তো ঢালাই ভেঙে যাবেই।” বেলাল মিয়া আরও বলেন, আমি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘর নির্মাণ করেছি। কোথাও কোনো অভিযোগ নেই। এখানে আমি শুধু কাজের দায়িত্ব নিয়েছি মালামাল দিচ্ছে সদর উপজেলা প্রশাসনের লোক। মালামাল ক্রয়ে আমার নিজের কোনো হাত নেই।
নির্দেশিকা অনুসারে ঘরগুলো নির্মাণে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা রয়েছে। নকশা মোতাবেক ইটের সংখ্যা, সিমেন্ট ও বালুর পরিমাণও উল্লেখ করে দেওয়া আছে। কিন্তু বাস্তবে এসবের সঙ্গে কোনো কিছুরই মিল পাওয়া যায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি থাকলেও কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খোলাহাটি ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম হক্কানী বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে আমি অবগত আছি। তবে একাধিক লোকের অভিযোগ, এই ঘর নির্মাণে নিম্নমানে সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। যে প্রকৌশলীকে দেখভাল করার কথা ছিল, তিনি সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী জুবায়ের হোসেনকে এই প্রতিবেদক গতকাল সোববার বিকেলে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেন নি।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো মাহমুদ আল হাসান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। স্থানীয়রা যেহেতু ইট গুলো খারাপ বলেছেন, তাই এই ইট আর ব্যবহার করা হবে না। ইটগুলো পরিবর্তনের জন্য এখনই নির্দেশ দিচ্ছি। ওই এলাকায় পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution