
বাল্য বিয়ে প্রবন দেশের অন্যতম জেলা কুড়িগ্রাম। এ জেলায় প্রাথমিকের গন্ডি পেরুতে না পেরুতে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় কন্যা সন্তানদের। সেখানে নিজেদের বাল্য বিয়ে ঠেকিয়ে অন্যের বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে নাগেশ্বী উপজেলার বল্লভের খাষ ইউনিয়নের দরিদ্রপরিবারের তিনজন অদম্য কন্যা। এই অদম্যরা হলেন জোসনা, শারমিন ও ছামিহা। এর তিন জনই স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী। তবে কলেজ পর্যন্ত আসতে তাদের পারি দিতে হয়েছে বিপদাশংকুল অনেক পথ। শুধু বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ নয় অনেক দরিদ্রদের পাশে দাড়ানো, বৃক্ষরোপনসহ নানা সামাজীক কাজ করেন তারা।
এছাড়া নিজেদের লেখাপড়ার খরচ নিজেরা চালানো থেকে শুরু করে পিতাহীন দরিদ্র সংসারের দায়িত্বও কাঁধে নিয়েছেন তারা। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নিজেদের লেখাপড়া শেষে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন। তাদের এ পথ চলা সহজ ছিলো না। নানা প্রতিবদ্ধকতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছে তাদের।
কখনো পারিবারিক চাপ, কখনো সামাজীক চাপ আবার ছিলো অতি দরিদ্রতার কষাঘাত। কারো ছোট বেলায় হারাতে হয়েছে বাবাকে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। কিছুটা বুঝতে শেখা আর স্কুলে যাওয়ার বয়সে নিজেদের দ্বায়িত্ব নিজেদের নেয়া। পরে সংসারের দায়িত্ব কাধে তুলে নেয়া এ যেন অসম্ভব কাজকে সম্ভব করার মতো গল্প বোনা।
বল্লভের খাষ ইউনিয়নের রঘুরভিটা গ্রামের মৃত্যু লিয়াকত আলী মেয়ে জোসনা। জোসনারা ৫ ভাইবোন। বড় দুই বোনকে ছোট বেলায় বিয়ে দেয়া হয়। বাড়িতে থাকেন জোৎস্না, তার ভাই ও ছোটবোন। তিনজনই স্কুলের শিক্ষার্থী। তিনজনের খরচ চালাতে কষ্ট হতো পরিবারের। তাই পরিবার জোসনাকে বিয়ে দেয়ার সীদ্ধান্ত নেয়। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় বিয়ে হয় হয় অবসস্থা। এসময় নিজেই ভাঙ্গেন বিয়ে। ইচ্ছে ছিলো উচ্চতর লেখাপড়া করবেন তিনি। তবে হঠাৎ বাবার মৃত্যু। ভাইয়ের সংসার থেকে চলে যাওয়া।
অথৈ সাগরে পড়ার অবস্থা হয় তার। তবে দমে যায়নি সে। সংসারের সকল দায়িত্ব কাধে তুলে নিয়ে কৃষি কাজ থেকে বাজার ঘাট সকল কাজই করছে এখন। লেখা পড়াও চালিয়ে যেতে হয় একি সাথে। এখন সে স্থানীয় কলেজের অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্রী। সবকিছুর পাশাপাশি এলাকায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে নিরালস কাজ করে যাচ্ছে জোসনা। তার মতো আরোও কয়েক জন সাথী হয়েছে তার। বাল্য বিয়ে প্রতিরোধের একটি সংঠনের সভাপতি সে।
জোসনা জানান, ছোট বয়স থেকে লেখাপড়া শেষে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছে ছিলো। সেই থেকে বাল্য বিয়ে আমার পছন্দ ছিলো না। তাই নিজেকে বিয়ের পিড়িতে বসাই নাই। নানা সমালোচনা ও প্রতিবন্ধকতা পার করতে হয়েছে জীবনে। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে হয় আমাকে। মাঠে কৃষি কাজ থেকে বাজার-ঘাট সব কিছুই করতে হয় আমাকে।
মা,বোন ও বোনের সন্তান নিয়ে এখন আমার পরিবার। তবে এসব করেও এলাকায় বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ ও সামাজীক কাজ করি। এসব করতে আমাদের একটি সংগঠন আছে। যেটি স্থানীয় বেসরকারী প্রতিষ্ঠান মহিদেবের সিএনবি প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সংগঠনটির নাম বল্লভের খাষ যুব সংগঠন। এখানে ছেলে মেয়ে মিলে ৩৬ জন কাজ করি। আমি এ সংগঠনটির সভাপতি। ভবিষ্যতে আমি জনপ্রতিনিধি হতে চাই।
সংগঠনের অন্যতম দুই সদস্য মাদারগঞ্জ বকুলতলা এলাকার ছামিহা ও সারমিনের পরিবারের গল্প আরোও করুন। ১১মাস বয়সে বাবা হারান ছামিহা। ৪ বোনের সংসার নিয়ে বিপাকে পড়েন মা। কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করে আবার কখনো ভাপা পিঠার ব্যবসা করে সংসার চালিয়েছেন।
তবে এখন আর কষ্ট করতে হয়না তেমন। ছামিহা লেখাপড়ার পাশাপাশি সেলাই ও অনলাইন প্রমোশনের কাজ করে স্বলম্বী হয়েছেন। এখন নিজের কলেজের লেখা-পড়ার খরচ চালিয়ে সংসারও চালাচ্ছেন। যুব সংগঠনের সাথে সংযুক্ত হয়ে নানা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এখন সমাজের সমালোচনাকারীদের প্রশংসা পাচ্ছেন।
ছামিহা জানান, আগে একা একা সামাজীক কাজ করা দূরহ ব্যাপার ছিলো। এখন মহিদেব একটি সংগঠন করায় আমরা একযোগে কাজ করতে পারছি। নিজেরা অনেক কিছু জানতে পারছি। এলাকায় কণ্যার শিশু মা- বাবাকে সচেতন করতে পারছি। শারমিনের বয়স যখন সাত মাস তখন তাকেসহ তার মাকে ছেড়ে যান বাবা শহিদুল ইসলাম। সেই থেকে মামার বাড়িতে আশ্রিত হয়ে বড় হয়েছেন শারমিন। বড় হতে হতে মায়ের কষ্ট দেখেছেন নিজ চোখে।
১৬ বছর বয়সে বাবার সাথে দেখা হলেও দায় নেয়নি বাবা। ছোট বেলা থেকেই নিজের পায়ে দাড়ানো প্রতিজ্ঞা করে শারমিন। অল্প বয়সে বিয়ে আসলেও ঠেকিয়েছেন নিজ বুদ্ধিতে। বিয়ের আসর থেকে জরুরী আইনি সেবায় ফোন করে নিজেকে রক্ষা করেন বাল্য বিয়ে থেকে। এখন একযোগে বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে ছোটেন এপাড়া ও পাড়া। সচেতন করেন মানুষকে। তাদের সাহসী পদক্ষেপ ও তৎপড়াতায় সচেতন হয়েছেন অনেকে। আগে সমালোচনা করলেও এখন তারাই প্রশংসা করছেন তাদের।
বল্লভের খাষ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস,এম আব্দুর রাজ্জাক আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে এই তিন মেয়ে তার ইউনিয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে তার খুবই সোচ্চার। খবর পাওয়া মাত্রই তারা বাল্য বিয়ে বন্ধ করতে ছুটে যায়। মানুষকে সচেতন করে। তাদের এ কাজে আমি সবসময় সহযোগিতা করি। এভাবে কাজ করে গেলে একসময় বাল্য বিয়ে মুক্ত হবে আমার ইউনিয়ন।
প্রকাশক ও সম্পাদক- মোঃ হযরত আলী, নির্বাহী সম্পাদক- মোঃ মেহেদী হাসান
বার্তা সম্পাদক- এস এম ইকবাল সুমন । অফিস- গোমস্তাপাড়া, রংপুর-৫৪০০ । মোবাইল- ০১৮৯৬ ৪৩২৭০১
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী | Developed BY Rafi It Solution