রাজনীতি

ফুলবাড়ীতে আওয়ামী- লীগের ৮ প্রার্থী, দ্বিধাদ্বন্দ্বে নেতাকর্মীরা

অনিল চন্দ্র রায়,ফুলবাড়ী   কুড়িগ্রাম

২৭ মে ২০২৪


| ছবি: সংগৃহীত

ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ভোট দুই দিন পরেই। শেষ মুহুর্তে প্রচার প্রচারনায় ব্যস্ত সময় পাড় করছেন প্রার্থীরা। উপজেলা জুড়ে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগের পাশাপাশি উঠান বৈঠকে  ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এলাকার উন্নয়নসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।

তবে ভোটের মাঠে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ  অন্যান্য দল না থাকায় আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৮ প্রার্থী মাঠ ময়দানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই ৮ প্রার্থীর সাথে একই তালে তাল মিলে মাঠে ময়দানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন উপজেলা পরিষদে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুস ছালাম সুজা (আনারস) মার্কা। 

একই দলের চেয়ারম্যান পদে তিন প্রার্থী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সস্পাদক ও উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী সরকার (মোটরসাইকেল)। অন্য দিকে একই পদে শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এজাহার আলী (ঘোড়া) ও ভাঙ্গামোড় ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বাবু  (কাপ-পিরিচ) প্রতীকে লড়ছেন। 

এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ-যুবলীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ভোটের মাঠে প্রচার ও সভা সমাবেশে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তপ্ত করছেন নির্বাচনী মাঠ। এতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন অনেক দলীয় নেতাকর্মী।

অপর দিকে ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্কুল শিক্ষক উত্তম কুমার মোহান্ত  (টিবওয়েল), উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক  সম্পাদক মেহেদী হাসান (উড়োজাহাজ) মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উপজেলা যুব মহিলালীগের সভাপতি 

শামিমা খন্দকার পারুল (কলস), উপজেলা মহিলা লীগের সাবেক সভাপতি মোছা: নার্গিস বেগম (হাঁস) ও একই দলের। সহসভাপতি মোছা : লুনা শেখ (ফুটবল) প্রতীকে লড়ছেন। 

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক কয়েক জন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী জানান, চেয়ারম্যান পদে তিন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে দুই ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিন জনেই আওয়ামীলীগের 

প্রার্থী। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপজেলা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা একেক জন একক জনের পক্ষ নিয়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা রীতিমতো মাঠে-ময়দানে গণসংযোগের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এতে নিজ দলের প্রার্থীদের নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেছেন। আবার অনেকেই নির্বাচনে কোন প্রার্থী বিজয়ী হবেন তা নিয়ে পড়েন দোটানায়। 

উপজেলা ও তৃণমূল নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এজাহার আলী (ঘোড়া) মার্কার মনোনীত প্রার্থী হওয়ায় সরাসরি পক্ষ নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতাউর রহমান শেখসহ একটি অংশ ঘোড়া মার্কার কাজ করছেন। অন্য দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সস্পাদক ও বর্তমান  উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী সরকার (মোটরসাইকেল) মার্কার প্রার্থী মনোনীত হওয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আলী পোদ্দার রতনসহ একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল মার্কার পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের ক্ষেত্রেও। একই চিত্র উপজেলার ৬ টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা ভাগ হয়ে গেছেন।

এ দিকে চার চেয়ারম্যান  প্রার্থীর মধ্যে সব থেকে সম্পদের দিক থেকে ইন্জিনিয়ার আব্দুস ছালাম সুজা ও  এজাহার আলী কোটিপতি।

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফ নামায় জানা গেছে, বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী সরকার শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএস সি পাশ । তিনি কৃষি খাতে বার্ষিক আয় ২০ হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, সম্মানী ভাতা পেয়েছেন ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, নগদ ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৯৫ টাকা, ব্যাংকে নিজ নামে জমা ৫০ লাখ টাকা, ১০ ভরি সোনার মূল্য ৫০ হাজার টাকা, টিভি, ফ্রিজ ও আসবাপত্র বাবদ ৬০ হাজার টাকা, কৃষি জমি ৩ শতক ১৫ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর নামে ব্যাংকে জমা নামে ৩৮ লাখ টাকা । 

শিমূলবাড়ী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এজাহার আলীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এস এস সি পাশ । তিনি  কৃষি খাতে বার্ষিক আয় ৭৯ হাজার ২৩৩ টাকা, পারিবারিক আয় ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ৭৬৮ টাকা, নগদ জমা ৯০ হাজার ৭১৮  টাকা, ব্যাংক জমা ৩৮ লাখ টাকা। উপহারের ১০ ভরি সোনা, ১ লাখ টাকার টিভি-ফ্রিজ ও আসবাবপত্র,  পৈত্তিক সূত্রে ৩৫ বিঘা ৪২ শতক জমি বাসা  রয়েছে। তার স্ত্রী ৫০ হাজার টাকার সোনা ।

আব্দুস ছালাম সুজা বি এস সি ইন্জিনিয়ার । তার বার্ষিক কৃষি খাতে আয় ১ লক্ষ ৩০ হাজার ১৯২ টাকা, বাড়ি থেকে আয় ১ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকা, ব্যবসা আয় ৬০ লক্ষ ১৯ হাজার ৫৩০ টাকা পেশা ও অন্যান্য আয় ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, নগদ টাকা ১০ লাখ টাকা, ব্যাংকে  জমা ৬৫ লক্ষ টাকা, শেয়ার ১৪ লক্ষ টাকা, টিভি, ফ্রিজ ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা, আসবাপত্র ৭ লক্ষ টাকা, কৃষি জমি ১০ বিঘা মূল্য  ৩২ লক্ষ টাকা, ৪ টি ফ্লাট ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বাড়ী ৯০ লাখ টাকা, মৎস খামার ২৮ বিঘা ১ কোটি টাকা, তার স্ত্রীর নামে ৫৬ লক্ষ ১০ হাজার টাকা রয়েছে বলে তিনি ডাবল কোটিপতি।

ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বাবু বি এস এস (ডিগ্রি পাশ) । তার হলফনামায় উল্লেক করেছেন কৃষিখাতে আয় নেই। নগদ ৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, ব্যাংকে জমা  ১০ লক্ষ  টাকা, ব্যবসায় ৩ লাখ ২০ হাজার আয় হলেও কি ব্যবসা করেন তা উল্লেখ করেন নাই । গরু খামার থেকে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, স্ত্রীর নামে কোন টাকা নাই । জয়ের প্রত্যাশা নিয়ে ভোটারের দ্বাড়ে দ্বাড়ে ঘুরছে প্রার্থীরা ।

নাওডাঙা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম বন্ধন  জানান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে চার জনের মধ্যে দুজনই হ্যাভিওয়েট প্রার্থী। স্বাভাবিকভাবে একজনের পক্ষে গেলে আরেকজন ক্ষুব্ধ হবেন। তারপরেও তৃণমূলের নেতাকর্মী দুই হ্যাভিওয়েট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। এমন অবস্থায় আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। এই নেতা আরও  জানান, আমরা ইউনিয়নের রাজনীতি করি। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপজেলার শীর্ষ নেতারা প্রার্থী হওয়ায় তাদের পক্ষে বা বিপক্ষে নির্বাচনে অংশ নিলে ভবিষ্যতে পদ না পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। এক্ষেত্রে নেতা কর্মীদের মাঝে বিভেদ তৈরি হচ্ছে। যা সংঘাতে রূপ নিতে পারে, এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানেও শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আলী পোদ্দার রতন বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিপ্রায় অনুযায়ী নির্বাচনকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। যেহেতু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে না, তাই তারা পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। এতে কোনো বিভেদ দেখছি না।  তবে নেতা-কর্মীদের দলীয় শৃঙ্খলা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখতে অনুরোধ করেন তিনি। তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগের ৮ প্রার্থীর পক্ষে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নেতাকর্মীরা প্রার্থীর সাথে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাসহ উঠান বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। আমিও এক প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছি। তবে নির্বাচনের মাঠে কিছুটা মন কষাকষি থাকলেও নির্বাচন শেষ হলে নেতাকর্মীরা আবারও এক হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। 

উপজেলা  নির্বাচন অফিসের দেয়া তথ্য মতে, তৃতীয়  ধাপে উপজেলায় আগামী ২৯মে  অনুষ্ঠিত হবে ভোট। এ উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান মিলে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫২৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা ৭৪ হাজার ২২০ ও পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৭৩ হাজার ৩০৩ এবং  হিজরা সম্প্রদায়ের ভোটার সংখ্যা ১ জন। মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৫২টি। মোট ভোট কক্ষের সংখ্যা ৪০৪ টি। স্থায়ী ভোট কক্ষের সংখ্যা  ৩৩২ টি  ও অস্থায়ী ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭২টি বুথ রয়েছে।

ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রাণকৃষ্ণ দেবনাথ জানান, নিবার্চনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে পুলিশের বিশেষ টিমের পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মাঠে রয়েছে।

উপজেলা রিটার্রনিং কর্মকর্তা ও নির্বাহী অফিসার  রেহেনুমা তারান্নুম জানান, ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন তৃতীয় ধাপে আগামী ২৯ মে উপজেলায় ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন বলে জানান তিনি।

65