রাজনীতি

নাটকীয়তা পেরিয়ে গঙ্গাচড়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান সুজন

মাহফুজার রহমান, গংগাচড়া   রংপুর

৩০ মে ২০২৪


| ছবি: সংগৃহীত

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাচনে নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে  চেয়ারম্যান হিসেবে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন মোকাররম হোসেন সুজন। তিনি বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা। এদিকে রাতে ফলাফল ঘোষণার সময় কন্ট্রোলরুমে স্থানীয় সংসদ সদস্যর প্রবেশকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট, ইট পাটকেল নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার (৩০ মে) রাত দশটায় গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাচনের কন্ট্রোলরুমে স্থানীয় এমপি আসাদুজ্জামান বাবলু প্রবেশ করলে এ নিয়ে প্রতিবাদ জানান ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজন ও তার কর্মীরা। এসময় প্রার্থী সুজন সেখানে উপস্থিত হওয়া এমপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আচরণবিধি অনুযায়ী আপনি এখানে আসতে পারেন না। আপনি এখানে কেন। এখান থেকে চলে যান। হয় মরবো, না হয় মারবো। তবুও কোন অনিয়ম হতে দিবে না’।

এমপির কন্ট্রোল রুমে অবস্থান নিয়ে দেখা দেয় উত্তেজনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা ক্যাম্পাসে থাকা ঘোড়া প্রতীকের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে লাঠিচার্জ এবং রাবার বুলেট ছুড়ে সরিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসময় সুজন সমর্থকদের ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে দেখা যায় স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাকর্মীদেরও। এতে ছোড়া গুলিতে ছয় জনসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। পরে ওই মাঠ দখল করে নেয় আওয়ামীলীগ নেতা কাপ পিরিচ প্রতীক রুহুল আমিনের সমর্থকরা। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাহিদ তামান্না এমপি বাবলুকে অনুরোধ করে কন্ট্রোল রুম থেকে সরিয়ে দেন।

এর আগে সন্ধার পর থেকেই রুহুল আমিনের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১ হাজার ৭৪৩ ভোটে বিজয়ী হয়েছে বলে প্রচারণা চালান। এমনকি রুহল আমীনকে ফুলের মালা দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে থাকেন নেতাকর্মীরা। ফেসবুকের ফিডে ছড়িয়ে যায় সেই ছবি। এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে উপজেলার সদরে। সুজনের হাজার হাজার সমর্থকরা অবস্থান নেন ক্যাম্পাসে বাইরে রাস্তায় ও অলিগলিতে। এই পরিস্থিতির মধ্যে রাত এগারোটা বিশ মিনিটে সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ৮৩৩ ভোট বেশিতে মোকাররম হোসেন সুজনকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষনা করেন।
তিনি জানান, ঘোড়া প্রতিকে মোকাররম হোসেন সুজন পেয়েছেন ২৯ হাজার ৪১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি কাপ পিরিচ প্রতিকের রুহুল আমীন পেয়েছেন ২৮ হাজার ২০৮ ভোট। এই ঘোষনার পরপরই আবারও উপজেলা ক্যাম্পাস দখলে নেয় সুজনের সমর্থকরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও লাঠিচার্জ করে কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। পরে বিশাল বহর নিয়ে কন্ট্রোল রুমে থেকে বের হয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে হাত নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানান সুজন। এরপর বৃষ্টি ভেঙ্গে যান বড়াইবাড়ি এলাকার নিজ বাড়িতে। সেখানে বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার কর্মী অংশ নেন। পরে তিনি সেখানে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।

এসময় সুজন তার সমর্থকদের বলেন, ‘নানাভাবে নাটকীয়তা করে আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু আল্লাহর রহমতে সেটা হয়নি। আপনারা আমার কাছে কথা চেয়েছিলেন খলাই ভরাবো আমরা, কিন্তু সেই খলাই আনতে পারবেন কিনা। আমি আপনাদের কথা দিয়েছিলাম। সেই কথা আমি রেখেছি। কন্ট্রোল রুমে আমি স্পস্ট ঘোষণা দিয়েছিলাম। কেন্দ্র থেকে পাওয়া ফলাফলে আমি বিজয়ী। কিন্তু এমপি সেখানে উপস্থিত হয়ে সেটাকে প্রভাবিত করার চেস্টা করেছিল। আমি এমপিকে স্পস্ট করে বলেছি, হয় মরবো, না হয় মারবো। তবুও অনিয়ম হতে দেবো না। অনিয়ম করতে হলে আমার মরদেহের উপর দিয়ে করতে হবে। সেটা আমি করেছি। এর মধ্যে আইনশৃঙখলা বাহিনী আপনাদের কয়েক দফায় পিটিয়েছে। রাবার বুলেট ছুড়েছে। আপনারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একজন মেম্বার অজ্ঞান হয়েছেন। বহু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তারপরেও আপনারা মাঠ ছেড়ে যান নি। এজন্য আমি আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

সুজন আরও বলেন, ‘যারা আমার বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার চেস্টা করেছিল। তারা পারেনি। আল্লাহ কাউকে সম্মান দিলে সেই সম্মানে কেউ কোনভাবে কেড়ে নিতে পারবে না। আমি চাই আপনারা সহ যারা হেরেছেন সবাই মিলে একসাথে পরামর্শ উন্নয়ন এবং জবাবদিহীতামুলক প্রশাসন গড়ে তুলবো। এসময় তিনি সমর্থকদের শান্তিপুর্নভাবে সবার সাথে থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, আমরা মার খেয়েছি। কিন্তু কাউকে মার দেবো না। তাদের বুকে টেনে নিয়ে একসাথে চলবো।

সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাহিদ তামান্না জানান, ‘এমপি স্যার কন্ট্রোল রুমে এসেছিলেন। আমি তাকে অনুরোধ করে সরিয়ে দিয়েছি। সেসময় সামান্য উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। আইনশৃঙখলাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। উপজেলায় সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মোকাররম হোসেন সুজন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে সীমা বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন।

তিনি বলেন, কেউ আচরণ বিধি লংঘন ও আইনশৃঙখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেস্টা করলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। বিধির বাইরে গেলে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।‘বিজয়ী সুজন জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতা। নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এখানে বিএনপি থেকে আরও কামরুজ্জামান লিপ্টন নামের আরও একজন চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি ১৭ হাজার ১০৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। তাকেও বিএনপি থেকে শোকজ করা হয়েছে।

এখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বর্তমান চেয়ারম্যান রুহুল আমীন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও আরও তিনজন প্রার্থী ছিলেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। এখানে লাঙ্গল প্রতিক নিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান পেয়েছেন মাত্র ৪২২ ভোট। গঙ্গাচড়ার নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই স্থাণীয় এমপি আসাদুজ্জামান বাবলুর বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি চেয়ারম্যান প্রার্থী রুহুল আমীনের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেয়ার অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ জানায় তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজন।

এই প্রেক্ষিতে ২৫ মে এমপি বাবলুকে সতর্ক করে চিঠি পাঠান গঙ্গাচড়া উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন অফিসার মোঃ রবিউল আলম। চিঠিতে উল্লেখ করা হয় গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজন ইসিতে অভিযোগ করেন স্থাণীয় এমপি আসাদুজ্জামান বাবলু রুহুল আমিনের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। যা নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা ২০১৬-এর ২২ বিধির পরিপন্থি।

চিঠিতে এমপি বাবলুকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচনি প্রচারণা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে। সব বিষয়ে এমপি আসাদুজ্জামান বাবলু জানান, ‘আমি ইউএনও অফিসে গিয়েছিলাম পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য। গিয়েই ফিরে এসেছি। আইনশৃঙখলাবাহিনী বিধি অনুযায়ী তাদের ব্যবস্থা নিয়েছে। ভোট সুষ্ঠু ও গ্রহনয়োগ্য হয়েছে। আর মোকাররম হোসেন সুজনের অভিযোগ সঠিক নয়। বিএনপি জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী সুজন আতংক তৈরি করার জন্যই শুরু থেকেই আমার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন। তিনি হেরে গেলেও একই অভিযোগ করতেন। এরা এরকমই। না আসবো বলেও নির্বাচনে আসে। জিতে ভালো। হারলে বলে প্রভাব বিস্তার। এদের কথায় কান দিতে নেই।’

60