মতামত

যুবসমাজের অবক্ষয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে  সমাজ জসিম উদ্দিন

ডেস্ক   দিনাজপুর

০৮ জুন ২০২৪


| ছবি: সংগৃহীত

রাতের অন্ধকার দূর করে প্রভাতের সূর্যকে স্বাগতম জানায় যুবসমাজ, পাহাড় সমান বাধা অতিক্রম করে বিজয় ছিনিয়ে আনা আজকের এই যুবসমাজই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে যুবসমাজই পারে দেশকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। একটি দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে যুবসমাজ যখন খারাপ পথে ধাবিত হয় তখন দেশ ও সমাজের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা যায়। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নেমে আসতে পারে চরম দুঃখ-দুর্দশা, বিপর্যয় ও হতাশা। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষই যুবসমাজের মূল্যবান কার্যকরী অংশ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে যুবসমাজকে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে পরিণত করবেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার ক্রমাগতভাবে তরুণদের কর্মমুখী করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে সরকার যুবসমাজে তরুণদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন- যুব দিবস পালন, যুব মেলার আয়োজন ইত্যাদি। এ লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদফতর নিয়ে থাকে ব্যাপক কর্মসূচি। নৈতিকতা, মাদক, শিক্ষা,এবং পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় একটি ভয়াবহ ব্যধি বলা যায়। বর্তমানে এই ব্যাধিগুলো যুব সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। এই অবস্থা চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার ধাবিত হবে। এই অবক্ষয়ব্যাধি যুবপ্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য দরকার সুস্থ রাজনীতি, সমাজে স্থিতিশীলতা এবং নৈতিক শিক্ষা।

আমাদের দেশের যুবসমাজ আজ নানা ধরনের নৈতিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। সচেতন সমাজের মানুষ মনে করেন, তরুণদের এই নৈতিকতার অবক্ষয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। যার ফলে দেশে অপসংস্কৃতির বৃদ্ধি হয়ে দেশ ও সমাজকে প্রলোভিত করছে। বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির প্রভাবে আমাদের যুব সমাজ অসংখ্য সংকট ও সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে। কিছু মনোনিবেশ পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে আজকের যুবসমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। যা কিনা তরুণদের জীবনে সুধারণ এবং আগামীতে তাদের প্রয়োজনীয় সহায় প্রদান করে একটি সন্দর সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। তার মধ্যে পেশাদান শিক্ষা: যুবসমাজের অবক্ষয়রোধ করে গড়ার জন্য উচ্চ মানসম্মত শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা একজন ব্যক্তির জীবন এবং সমাজের উন্নতির মাধ্যম। তরুণদেরকে পেশাদান শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সাহায্য করতে একটি প্রাধিকৃত প্রোগ্রাম চালানো হতে পারে।

কৌশল উন্নত করা: তরুণদেরকে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পড়াশোনা এবং কৌশল উন্নত করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে এবং তা ক্রমাগত বৃদ্ধি প্রদান করে সরকারিভাবে মনিটরিং করতে হবে যা কিনা কৌশলের দিক থেকে উন্নত করতে সাহায্য করবে, এই কৌশলগুলো তাদের কাজের পারদে এবং ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করতে পারে এবং দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর বয়ে আনতে পারে। সোশ্যাল সাপোর্ট মেন্টরিং: তরুণদের জন্য সোশ্যাল সাপোর্ট এবং মেন্টরিং প্রদান করা যেতে পারে। এতে করে আজকের যুব সমাজ একটি প্রক্রিয়ায় দেশকে এগিয়ে নিবে, যেখানে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা একজন নবীন ব্যক্তিকে তার শিক্ষানবিশকালে দলবদ্ধভাবে সহায়তা করবে। 

বিশেষ প্রকল্প: একটি বিশেষ প্রকল্প সূচনা করলে, সেখানে তাদের শখ এবং ক্যারিয়ার পছন্দ নির্ধারণ এবং যুবসমাজের নিজ নিজ ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। যা তাদের ভবিষ্যতে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে সঠিক পথের জীবন পরিচালিত ও উৎসাহিত করতে সাহায্য করবে। সময় প্রবন্ধন: কাজের ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে, এবং সামাজিক জীবনের ক্ষেত্রে সময় প্রবন্ধন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময় পরিবর্তনে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা আজকের যুব সমাজের একটা ফ্যাশন। কেননা, পৃথিবী প্রবর্তনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সময়ের সাথে সাথে পাল্টেছে সমাজের জীবন যাত্রা। তাই সময়কে গুরুত্ব দিয়ে যুবসমাজকে সময়পযোগী করা প্রয়োজন।

যুবসমাজ সচেতন হলে দেশ ও জাতি উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে, বাড়বে সুশীল সমাজ ও সমাজের মূল্যবোধ। একটি সঠিক সমৃদ্ধ, সমর্থ, এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা যেতে পারে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। 

এ ছাড়াও মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় দেশ। এ দেশে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ একত্রে বসবাস করে। কিন্তু ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত হওয়ার কারণেই স্বাভাবিকভাবে এদেশের সংস্কৃতি ইসলামি ভাবধারার হওয়া উচিত। অন্যদিকে অপসংস্কৃতির করাল গ্রাস দেশে সহজ-সরল মানুষের অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে ও সাক্ষাৎ ধ্বংসের দিকে নিপতিত করেছে। কথিত আধুনিকতা, অপসংস্কৃতি ও সভ্যতা নামের অন্ধকার বেড়াজালে বন্দি মুসলিম জাতি আজ হতাশাগ্রস্ত ও স্তম্ভিত। মুসলিম জাতি হারিয়েছে গৌরবান্বিত ঐতিহ্য, নিঃশেষ হয়েছে তাদের উন্নত সংস্কৃতি। ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী সাম্রাজ্যবাদ, স্বার্থান্বেষীরা মুসলিম বিশ্বকে পিছিয়ে রাখতে তাদের উন্নত সংস্কৃতি ও নৈতিক চরিত্রে ভাঙন ও বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য ধীর অথচ দৃঢ়ভাবে নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে। তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সংস্কৃতির নোংরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে কিছু মুসলিম নামধারী এদেশীয় দোসর, তল্পিবাহক ও ক্রীড়নকদের।

মানুষের জীবন সূচি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ সময় যৌবন কাল (১৬-৪০)। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ জনগোষ্ঠী। সত্তর দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের যুবসমাজের জ্যামিতিক অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৯৭১ সালে ২৩.১৯ শতাংশ; ১৯৭৩ সালে ২০ শতাংশ; ১৯৮১ সালে ২৪.৫০ শতাংশ এবং ১৯৯১ সালে ৩০.২০ শতাংশ যুবক ছিল যাদের বয়স ১৬-৪০ বছরের মধ্যে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যাপীঠে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যুবক ৬০ শতাংশ এবং যুবতী ৫০ শতাংশ নেশাগ্রস্ত। শীর্ষস্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্রের সাম্প্রতিক জরিপ রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, নেশাগ্রস্ত ও অবৈধ চোরাচালান ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শতকরা ৯০ জন তরুণ-তরুণী, বস্তিবাসী ও কর্মসংস্থানহীন। দেশের মোট জনসংখ্যার বৃহদাংশ আজ অপসংস্কৃতির মরণ থাবার খোরাকে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন পরিবার, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পিতা-মাতার অসচেতনতা, সমাজ সংস্কার মুক্ত চিন্তাধারা, দারিদ্র্যের হিংস্র ছোবল, খাম-খেয়ালিপনা সর্বোপরি বিদেশি অপসংস্কৃতি ওই করুণ পরিণতির জন্য মূলত দায়ী।

25