1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
ফুলবাড়ীতে স্কুলশিক্ষক গড়ে তুলেছেন ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’  | দৈনিক সকালের বাণী
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৪ অপরাহ্ন

ফুলবাড়ীতে স্কুলশিক্ষক গড়ে তুলেছেন ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’ 

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম)
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৪
  • ৩৩৩ জন দেখেছেন
বিখ্যাত সকল লেখক ও কবিদের রচিত গ্রন্থ, বহু পুরনো ম্যাগাজিন ও পত্রিকা সংগ্রহ করে দশ শতক জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর। এখানে কবি ও লেখকদের ছবিসহ তাদের জীবনী সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে কবি ও লেখকদের দূর্লভ চিঠিও। ইতোমধ্যে বঙ্গভাষা জাদুঘর গড়ে তোলায় ব্যাপক প্রশংসা পুড়িয়েছেন স্কুল শিক্ষক  তৌহিদ উল  ইসলাম। বঙ্গভাষা জাদুঘর দেখত কুড়িগ্রাম -লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষজন ঘুরতে আসেন। এই বঙ্গভাষা জাদুঘরটি গড়ে উঠেছে দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের সীমান্তঘেষা ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে ১১ কিলোমিটার দুরে বড়ভিটা ইউনিয়নের সবুজেঘেরা নিভৃত পল্লী উত্তর বড়ভিটা গ্রামে।
এটি গড়ে তুলেছেন স্কুলশিক্ষক তৌহিদ-উল ইসলাম (৫৮)। ওই নিভৃত পল্লী উত্তর বড়ভিটা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পার্শ্ববর্তী জেলার লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তৌহিদ-উল ইসলাম বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভির একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার। তিনি ভাওয়াইয়া ও আধুনিক গান রচনা করেন। জাদুঘর ছাড়াও এই স্কুলশিক্ষক দুই শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলেছেন একটি আধুনিক পাঠাগার ও দুই শতাংশ জমির ওপর একটি কালচারাল ক্লাব। ‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননার দুই লাখ টাকা তাকে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে স্বপ্ন দেখায়।
স্কুলশিক্ষকের গড়ে তোলা ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’ বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘লেখক জাদুঘর’। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এই জাদুঘর চালু করা হয়। দেশের প্রথম লেখক জাদুঘর ২০১১ সালে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে চালু করা হয়।  জাদুঘরটিতে ৫টি গ্যালারি জুড়ে রয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রায় দুই শতাধিক প্রয়াত কবি ও লেখকের তথ্য সম্বলিত ছবি। এখানে রয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা চলচ্চিত্রের অসংখ্য বিলুপ্ত পত্র-পত্রিকা। এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সম্পাদিত ১৯৩৬ সালের মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা। কালীশ মুখোপাধ্যায়ের ১৯৪৫ সালের ‘রূপ-মঞ্চ’ এবং শ্রী দিলীপ সেন গুপ্ত সম্পাদিত ১৯৫৫ সালের ‘সচিত্র ভারতী’ পত্রিকা।   দুই বাংলার সিনেমার পত্রিকাও রয়েছে অনেক। ১৯৬০ সালের মার্চ সংখ্যা মাসিক ‘মৃদঙ্গ’। ক্ষিতীশ সরকার সম্পাদিত ১৯৬১ সালের ‘জলসা’ পত্রিকা আছে । আবু জাফর সম্পাদিত ১৯৬৩ সালের ‘সন্দেশ’ এবং গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ১৯৬৮ সালের ‘সচিত্র সন্ধানী’ রয়েছে এখানে। ১৯৫৯ সালের সাপ্তাহিক ‘পাকিস্তানী খবর’ এবং ১৯৫৯ সালের ‘পাক-সমাচার’ আছে এ জাদুঘরে। ধর্মীয় পত্রিকা মাসিক ‘নেয়ামত’ এবং ১৯৬১ সালের ‘সমকাল’ আছে এখানে। ১৯৬৬ সালের ‘পূবালী’ পত্রিকাসহ ‘বেগম’ পত্রিকার সংখ্যা আছে এখানে।  ১৯৬৮ সালের বিমল মিত্র সম্পাদিত ‘কালি ও কলম’ পত্রিকা আছে। ১৯৬৮ সালের রবীন্দ্র ভারতী পত্রিকা, ১৯৬৯ সালের বিশ্বভারতী পত্রিকা এবং ১৯৭০ সালের কবীর চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমি পত্রিকা সংরক্ষণ কেরা হয়েছে এ জাদুঘরে। রেডিও পাকিস্তানের পাক্ষিক পত্রিকা ‘এলান’ রয়েছে এ খানে।১৯৫১ সালে প্রকাশিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রচিত ৭ম ও ৮ম শ্রেণির ব্যাকরণ পরিচয়। সুবলচন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ১০০ বছরের পুরনো ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’। এ ছাড়া একশ বছর আগে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি বই। এখানে রয়েছে ১৫০ বছর পুর্বে বঙ্কিম চন্দ্র সম্পাদিত পত্রিকা ‘বঙ্গদর্শন’ ১১০ বছর পুর্বে প্রমোধ চৌধুরী সম্পাদিত পত্রিকা ‘সবুজপত্র’। এ জাদুঘরে রয়েছে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সাপ্তাহিক হক-কথা। এছাড়া এখানে রয়েছে ১৯৬৫-১৯৭২ সালের দৈনিক ইত্তেফাকসহ বেশ কিছু দৈনিক পত্রিকা।
স্কুলশিক্ষক তৌহিদ-উল ইসলাম ২০২২ সালে ‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা’ পান। এ সম্মাননায় পাওয়া দুই লক্ষ টাকায় শুরু করেন জাদুঘর নির্মাণকাজ।  নিজের ব্যক্তিগত আরও কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করেন। নিজ খরচে ২০১১ সালে গীতিকার তৌহিদ-উল ইসলাম পাঠাগার ও  ২০২১ সালে সৈয়দ শামসুল হক কালচারাল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। পাঠাগারে রয়েছে ৬০০০ বই ও পত্র-পত্রিকা। তিনি ব্যক্তি উদ্দ্যোগে ২০২১ সাল থেকে চালু করেছেন সৈয়দ শামসুল হক শিশুসাহিত্য পুরস্কার। পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতিবছর গুণিজনদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়ে থাকে।
পাঠাগারে গ্রামের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গ্রামের শিক্ষিতজনরা আসেন। তারা এখান থেকে বই বাড়ীতে নিয়ে অধ্যায়ণ করেন। শিশুদের বই পড়ায় মনোযোগী করতে পাঠাগারে আসা শিশুদেরকে দেওয়া হয় চকলেট। প্রতিদিনেই বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন ’বঙ্গভাষা জাদুঘর’ দেখার জন্য। তারা এখানে এসে পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জেনে সমৃদ্ধ হচ্ছেন। সপ্তাহে প্রতি শনিবার জাদুঘর ও পাঠাগার খোলা রাখা হয়।
লালমনিরহাট থেকে আসা দর্শনার্থী এস দিলীপ রায় ও ফুলবাড়ী পানি মাছকুটি এলাকায় দর্শনার্থী স্কুল শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জানান, বঙ্গভাষা জাদুঘর’ দেখতর এসে আমরা হারিয়ে যাওয়া বাংলা সাহিত্যের অনেক তথ্য জানতে পারলাম। এ জাদুঘরে দূর্লভ অনেক তথ্য ও ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ জাদুঘরটি ঘুড়ে দেখলে অনেক পুরনো ইতিহাস জানা যাবে। ’ সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ দেখে স্কুলশিক্ষকের প্রতি সম্মানবোধ বেড়েছে। বর্তমানে সমাজ ও দেশকে নিয়ে তার মতো মানুষ খুব কম লোকই ভাবেন  এই স্কুল শিক্ষকের স্বপ্ন গুলো স্বার্থক হোক ও আমরা সাফল্য কামনা করছি স্কুলশিক্ষার্থী শাপলা রানী ও তুলি খাতুন বলেন, ‘আমরা পাঠাগারে বই পড়তে আসলে চকলেট পাই। গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এই পাঠাগারে বই পড়ে জ্ঞানসমৃদ্ধ হচ্ছি। আমরা এখান থেকে বই বাড়ীতেও নিয়ে যাই। বইপড়া শেষে পাঠাগারে বইগুলো আবার ফেরত দেই। পাঠাগারটি আমাদের গ্রামে জ্ঞানের প্রদ্বীপ জ্বালিয়েছে।
বঙ্গভাষা জাদুঘরের পরিচালক ও  বিশিষ্ট  সংবাদকর্মী মাজফুজার রহমান জানান, জাদুঘরে পুরাতন দুর্লভ পত্র-পত্রিকার মূল কপি সংরক্ষিত আছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ জাদুঘরের ঐতিহাসিক মূল্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। কালচারাল ক্লাবে গ্রামের লোকজন সমবেত হয়ে দেশীয় কালচার চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছেন। ‘জাদুঘর, পাঠাগার ও কালচারাল ক্লাব আমাদের গ্রামকে সুপরিচিত করাচ্ছে। গ্রামে জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য চর্চা ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘স্কুলশিক্ষক ও গীতিকার তৌহিদ-উল ইসলাম অত্যন্ত সাদা মনের মানুষ। নিজের উপার্জিত টাকায় তিনি সমাজ ও দেশের সেবা করছেন। তিনি আরও জানান স্কুলশিক্ষক তৌহিদ-উল ইসলাম জাদুঘর, পাঠাগার ও কালচারাল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে কিছু জমি বিক্রি করেছেন। এখন তার আবাদি জমি রয়েছে মাত্র দুই বিঘা। তার এক ছেলে অনুপম সৈকত অপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে অধ্যয়ণ করছেন। এক মেয়ে নীলাজ্ঞনা সৈকত নীলা অধ্যয়ণ করছেন একাদশ শ্রেণিতে। তার স্ত্রী বেগম আমিনা সুলতানা গৃহিনী। তৌহিদ-উল ইসলাম মৃত রহিম উদ্দিন ও সোনাভান বেগমের ছেলে। তিনি ৫ ভাই ও এক বোনের মধ্যে চতুর্থ।  তিনি মাস্টার্স অব এডুকেশন (এমএড) সম্পন্ন করেছেন।
স্কুলশিক্ষক তৌহিদ-উল ইসলামের স্ত্রী আমিনা সুলতানা জানান, প্রথম দিকে আমার স্বামীর এসব কর্মকান্ড দেখে পাগলামি মনে হয়েছিল। এখন মনে করছি আমার স্বামী সমাজ ও দেশের প্রতি একজন  দায়িত্ববান মানুষ। সামাজিক কাজকর্ম করতে গিয়ে তিনি মাঝে মাঝে পরিবারের কথাই ভূলে যান। ‘আমার স্বামীকে কোন দিনই কাজ ফাঁকি দিতে দেখিনি। তিনি সময় মতোই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। তিনি আমাদের পরিবারকে একটি আদর্শ পরিবার হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তিনি আরও জানান । আমরা এক সময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো কিন্তু আমার স্বামীর কর্ম আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখব দীর্ঘদিন।
স্কুলশিক্ষক গীতিকার তৌহিদ-উল ইসলাম জানান, আমি যে উপার্জন করি তার অর্ধেক টাকা ব্যয় করি বঙ্গভাষা জাদুঘর, পাঠাগার ও কালচারাল ক্লাবের উন্নয়নের কাজে। গেল একযুগ ধরে তিনি প্রাচীন ও দূর্লভ বই, চিঠি, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও ছবি সংগ্রহ করছেন। প্রতিটি দূর্লভ জিনিস সংগ্রহ করতে তাকে ৫-১৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। কারো কাছে দূর্লভ কিছু রয়েছে এমন তথ্য পেলে তিনি তার কাছে ছুটে যাচ্ছেন। ‘সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আমি এসব করছি। এতে আমি তৃপ্তি পাই। আমার অবর্তমানে আমার স্বপ্নগুলো যাতে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্বপ্নগুলো সঠিক বীজ বপন করতে পারে সে জন্য আমার সন্তানদের সেভাবে তৈরি করছি। আমার সংগ্রহ এ প্রজন্মের মানুষকে জ্ঞানপিপাসু করে গড়ে তুলছে। এসব সংগ্রহ আগামী নতুন প্রজন্মকেও ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। এই বঙ্গভাষা জাদুঘরটি আধা পাকা ঘরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তবে এ ঘরে সংগৃহিত তথ্যাবলি সুরক্ষিত নয়। এগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হলে পাকা ভবন থাকা দরকার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে খুবই ভালো হতো।
যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া না যায় তাহলে আমার চাকুরি শেষে যে অর্থ পাবো তা দিয়ে আমার স্বপ্নকে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে জানান তিনি ।আমার হাতে গড়া বঙ্গভাষা জাদুঘর, পাঠাগার ও কালচারাল ক্লাব অবশ্যই জাতি গঠণে অগ্রনী ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )