


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। সেইসঙ্গে, হরমুজ প্রণালীর কাছে কমপক্ষে তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে দেশটি। এসব ঘটনার জেরে বিশ্বব্যাপী বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। ইতোমধ্যে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়েছিল। যদিও পরে সূচক কিছুটা নিম্নমুখী হয়। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৭২ ডলার ১৫ সেন্টে উঠে যায়। যদিও গত সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক কেনাবেচার সর্বশেষ দিন শুক্রবার পণ্যটির মূল্য স্থির হয়েছিল প্রায় ৬৭ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। শুক্রবার দিন শেষে পণ্যটির মূল্য স্থির হয়েছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার ৮৭ সেন্টে। সোমবার রাত পৌনে ৮টায় প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৮ ডলার ৮৪ সেন্টে স্থিত হয়। যদিও দিনের শেষভাগে ব্যারেলপ্রতি ক্রুড অয়েলের দাম ৭৯ ডলার ৪১ সেন্টে উঠেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে দেশটির প্রতিবেশীরাও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। হরমুজ প্রণালির কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার পর বৈশ্বিক তেলের বাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ইরানের সীমান্তঘেঁষা এ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান থেকে রপ্তানীকৃত জ্বালানি তেল ও গ্যাস বা এলএনজিবাহী ট্যাংকার চলাচল করে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সারা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল-গ্যাস ওই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। দেশটির দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ওই জলপথ দিয়ে নৌ-যান চলাচল না করার জন্য সতর্ক করেছে তেহরান। এতে ওই প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তেলের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় তেলবাহী দুটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।
দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর মধ্যে সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড অয়েল থেকে জ্বালানি তেল কেনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিসি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিপিসির আগামী ছয় মাসের জ্বালানি তেলের ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া দেশে এক মাসের জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে বলে গত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিশ্চিত করেছে বিপিসি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার পরিধি বিস্তৃত ও দীর্ঘ হচ্ছে। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে অনেক তেলবাহী ট্যাংকার আটকা পড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি তেল পরিবহনে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের বাজারে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে গত শনিবার বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আগামী জুন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। পরিশোধিত জ্বালানি তেল মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে। এসব দেশ থেকে জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে ক্রুড অয়েলের বিষয়টি (পণ্য পরিবহনে) আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।’ এদিকে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার কারণে আমদানিনির্ভর দেশগুলো এরই মধ্যে এশিয়ার বৃহৎ সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। খোলাবাজার থেকেও জ্বালানি তেল কেনার ক্ষেত্রে আমদানিকারক দেশগুলোর তোড়জোড়ের কথা জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশও বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে বলে জ্বালানি বিভাগসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়ার বৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকারী চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুরের বাজারেও দাম উর্ধগতি। এছাড়া এসব বাজার থেকে অতি দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করাটাও সহজ নয় বলে মনে করেন তারা।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল সংগ্রহে জাহাজের সংকট বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া জাহাজের প্রিমিয়ামও বেড়ে যাওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে বলে জ্বালানি আমদানিকারকরা জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে দেশগুলোর জ্বালানি তেল স্থাপনায় ইরানের ক্রমবর্ধমান হামলা। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি জায়ান্ট সৌদি আরামকোর রাস তানুরা পরিশোধনাগারটি এখন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ পরিশোধনাগারের দৈনিক সক্ষমতা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল। পরিশোধনাগারের পাশাপাশি কমপ্লেক্সটি সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল রপ্তানির একটি টার্মিনাল হিসেবেও কাজ করে। ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ ইরান। বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জোগান দেয় দেশটি। এখানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট ও অন্যান্য তরল জ্বালানিও রপ্তানি করে দেশটি।
এদিকে, তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির সংগঠন ওপেক প্লাসের সদস্যরা তাদের তেলের উৎপাদন আগের চেয়ে বাড়িয়ে প্রতিদিন দুই লাখ ছয় হাজার ব্যারেল করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এতে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যাবে বলে আশা করছে তারা। যদিও এই কৌশলটি কতটা কাজে দিবে, সেটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করছেন। যুক্তরাজ্যের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএ) প্রেসিডেন্ট বলেছেন, চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে পেট্রোলের দাম বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে অস্থিরতা এবং বোমা হামলার ঘটনা দেখা যাচ্ছে, সেটি নিশ্চিতভাবেই সারা বিশ্বের তেল বিতরণ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করার জন্য অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম অনিবার্যভাবে বেড়ে যাবে। অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন সময় ধরে বাড়তে থাকলে সেটি কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, তাহলে সেটি খাদ্য, কৃষি ও শিল্প পণ্যের মতো অন্যান্য অনেক পণ্যের দামের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করবে। প্রকৃতপক্ষে এটি মুদ্রাস্ফীতিতে পরিণত হবে। যুক্তরাজ্যে মুদ্রাস্ফীতির গতি আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে। সেই কারণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও সুদের হার কমাতে শুরু করেছে। সুদের এই হার আগামীতে আরও কমানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইঙ্গিতের পরও যুক্তরাজ্যে ব্যাংক সুদের হার আপাতত তিন দশমিক ৭৫ শতাংশে আটকে থাকতে পারে।
ইরানের ড্রোন হামলায় কাতার এনার্জির জ্বালানি স্থাপনা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলে সংস্থাটি সাময়িকভাবে এলএনজি উৎপাদন ও সরবরাহ সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। হরমুজ প্রণালিও বন্ধ রয়েছে। এ প্রণালি হয়ে এলএনজি পরিবহন এক মাস বন্ধ থাকলে এশিয়ার স্পট মার্কেট এলএনজির দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম ২৫ ডলারে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং এবং আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস। যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার। সারা বিশ্বে চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করে দেশটি, যার সবটাই রপ্তানি হয় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। বাংলাদেশেও এলএনজির বড় সরবরাহকারী দেশ কাতার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ যদি কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকে, তাহলে বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে গেলে আর্থিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) হিস্যা দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যার বড় সরবরাহকারী কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কাতার এনার্জি। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি হয় তার ৪০ শতাংশ সরবরাহ করে এ সংস্থা। দীর্ঘমেয়াদে কাতার এনার্জির এলএনজি উৎপাদনসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকলে তা দেশের গ্যাস খাত থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বড় প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা।
দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় গত সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে কাতারের এলএনজি বড় ভূমিকা রাখছে। দেশে গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে কাতারের এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। এই এলএনজি বর্তমানে দেশের শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘কাতারের এলএনজি উৎপাদনসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকাটা দীর্ঘমেয়াদি হলে তা দেশের গ্যাস খাতকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুতে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় তা কমে গেলে বিদ্যুতে লোডশেডিং হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’