1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
ওষুধের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, এমআরনির্ভর বিপণনে বাড়ছে অনৈতিকতা | দৈনিক সকালের বাণী
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন

ওষুধের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, এমআরনির্ভর বিপণনে বাড়ছে অনৈতিকতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ২৫ জন দেখেছেন

টেলিভিশন কিংবা সংবাদপত্রে প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের বিজ্ঞাপন বাংলাদেশে প্রায় অদৃশ্য। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধের কার্যকারিতা, ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সরাসরি ভোক্তাদের তথ্য দেওয়া হয়। দেশের স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে রোগীরা প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের কেন্দ্র করে এমন এক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা ক্রমেই অনৈতিক চর্চার দিকে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরাসরি বিজ্ঞাপনের সুযোগ না থাকায় ওষুধ কোম্পানিগুলো বিপণনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের (এমআর)। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসকদের চেম্বারকেন্দ্রিক এই বিপণন কার্যক্রমে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সেমিনার, বিদেশ সফর, উপহারসামগ্রী, এমনকি নগদ অর্থের মাধ্যমেও চিকিৎসকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়, যাতে তাঁরা নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ বেশি প্রেসক্রাইব করেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের মোট টার্নওভারের প্রায় ২৯ শতাংশ বিপণনে ব্যয় করে। ২০১৮ সালের হিসাবে ওষুধ বাজারের আকার ছিল প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে বিপণন ব্যয় ছিল প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞার ফলে কোম্পানিগুলো বিক্রয় প্রতিনিধিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে বাজারে আগ্রাসী বিপণন কৌশল তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদের মতে, ওষুধ সম্পর্কিত তথ্য প্রচারে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকারকে সীমিত করছে। তিনি বলেন, ওষুধের উপকারিতার পাশাপাশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও মানুষের সচেতন থাকা জরুরি। বিশেষ করে ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত ও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছানোর জন্য নিয়মতান্ত্রিক বিজ্ঞাপন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডে সরাসরি ভোক্তাদের উদ্দেশে প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচারের অনুমতি রয়েছে। সেখানে বিজ্ঞাপনে ওষুধের সুবিধার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হয়। কানাডার মতো কিছু দেশে সীমিত পরিসরে ওষুধের নাম বা রোগ সচেতনতামূলক প্রচারণার অনুমোদন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যের এই শূন্যস্থান পূরণে বাংলাদেশে চিকিৎসক ও এমআরদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে রোগীরা প্রায়ই জানতে পারেন না কেন কোনো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, এর বিকল্প কী বা সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী হতে পারে।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ওষুধ সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের অবাধ বিজ্ঞাপন মানুষকে স্ব-চিকিৎসায় উৎসাহিত করতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, হৃদরোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ওষুধের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

বায়োমেডিক্যাল গবেষক ড. হুমায়রা ফেরদৌস মনে করেন, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আশির দশকের নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ওষুধের জেনেরিক নাম, মূল্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য সরকারি প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করা হলে রোগীরা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের উপহার গ্রহণের কথা স্বীকার করেছেন। স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা প্রেসক্রিপশন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয় রোগীদেরই।

ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে ওষুধের তথ্য ও বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ তৈরি করা হলে রোগীরা আরও সচেতন হবেন। পাশাপাশি চিকিৎসক-ওষুধ কোম্পানির অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

তবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আকতার হোসেন বলেন, জনস্বার্থে ওষুধের তথ্য প্রচারে কোনো বাধা নেই। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহারে মানুষকে প্রলুব্ধ করা বা উদ্বুদ্ধ করার মতো প্রচারণা বিদ্যমান আইন সমর্থন করে না। তিনি বলেন, বিজ্ঞাপন বা বিপণনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে কোম্পানিগুলোর উচিত ওষুধের গুণগত মান উন্নয়ন এবং রোগীদের জন্য দাম সহনীয় রাখতে বিনিয়োগ করা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীর তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা এবং ওষুধ খাতে অনৈতিক বিপণন নিয়ন্ত্রণ—এই তিন বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )