1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
উচ্চতা মাত্র ২ ফুট ৯ ইঞ্চি, তবুও স্বপ্নের পথে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে মল্লিকা, মেয়ের স্বপ্ন পুরণে হতাশ দরিদ্র বাবা-মা  | দৈনিক সকালের বাণী
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১১:১১ পূর্বাহ্ন

উচ্চতা মাত্র ২ ফুট ৯ ইঞ্চি, তবুও স্বপ্নের পথে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে মল্লিকা, মেয়ের স্বপ্ন পুরণে হতাশ দরিদ্র বাবা-মা 

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯ জন দেখেছেন
উচ্চতা মাত্র ২ ফুট ৯ ইঞ্চি। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও থেমে নেই তার স্বপ্ন। নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে এবার উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (বিএমটি) শাখা প্রথম বর্ষ থেকে পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বামন প্রতিবন্ধী মল্লিকা খাতুন।
তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
শারীরিক গঠন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক ছোট হওয়ায় চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজে তাকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
দরিদ্র বাবা-মার সামান্য আয়ে সংসার চলছেও
তবুও কখনো হাল ছাড়েনি মল্লিকা। পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের দৃঢ় মনোবলকে পুঁজি করে নিয়মিত পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের সেই প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এবার সে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের প্রথম অধ্যয়ের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে।
মল্লিকা খাতুন ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজ (বিএমটি) শাখা প্রথম বর্ষ থেকে সাইফুর রহমান সরকারি কলেজ পরীক্ষা দিচ্ছেন।
তার বাড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম পানিমাছকুটি গ্রামের মনির হোসেন ও আকলিমা দম্পতির মেয়ে। তার ছোট বোন মেঘলা খাতুনের উচ্চতা ২ ফুট ৫ ইঞ্চি। সে মিয়া পাড়া দাখিল মাদরাসায় দর্শম শ্রেণীতে পড়েন।
মল্লিকা ও মেঘলা খাতুন তিন বোন ও দুই ভাই। সবার ছোট মল্লিকা ও মেঘলা।
বড় বোন মোর্শেদা ১০ বছর আগে অনেক কষ্টে বিয়ে দেন। বড় দুই ছেলে আশরাফুল ও আতাউর রহমানের আলাদা সংসার। তাদেরও সংসারও অভাব অনটন।
মল্লিকা ও মেঘলার মা আকলিমা বেগম বাড়ির সামনে একটি চায়ের দোকান দিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় ও দুই মেয়ের প্রতিবন্ধী ভাতায় চার সদস্যদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্ভল। দুই মেয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মা আকলিমার কষ্টের যেন শেষ নেই। তবুও খেয়ে না খেয়ে দুই মেয়েকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিকেই কিন্তু অর্থের অভাবে কি তার দুই মেয়ের স্বপ্ন পুরণে হতাশ সব সময় তারা করে।
পরীক্ষা কেন্দ্রে মল্লিকাকে দেখে অনেকেই তার সাহস ও অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেন। স্থানীয়দের মতে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারে না—মল্লিকা তারই বাস্তব উদাহরণ।
প্রতিবেশী আব্দুল মালেক লেচু, মালেক মিয়া ও মমিনুল ইসলাম মমিন জানান, দিনমজুর মনির হোসেন অত্যন্ত দরিদ্র। সুস্থ থাকাকালে দিনমজুরির কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাতেন তিনি। তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। এর মধ্যে ছোট দুই মেয়েই প্রতিবন্ধী। এক মেয়ের উচ্চতা মাত্র ২ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং সবার ছোট মেয়ের উচ্চতা ২ ফুট ৫ ইঞ্চি।
দুই ছেলে আলাদা সংসার করেন। আর বড় মেয়েকেও অনেক কষ্টে বিয়ে দিয়েছেন মনির হোসেন। বর্তমানে ছোট দুই প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটছে তাঁর পরিবারের। প্রায় পাঁচ বছর ধরে অসুস্থ থাকায় মনির হোসেন এখন কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে তাঁর স্ত্রী আকলিমা বেগমের কাঁধে।
আকলিমা বেগম গ্রামের একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সামান্য যে আয় করেন, তা দিয়েই কোনোরকমে দুই মেয়ের পড়াশোনা ও পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিবেশীরা আরও জানান, সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ালে প্রতিবন্ধী দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁরা পরিবারটির সহযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থী মল্লিকা খাতুন আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার বাবা-মায়ের সামান্য আয় দিয়েই আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অভাব-অনটন যেন আমাদের পরিবারের নিত্যসঙ্গী। আমি একা নই, আমার মতোই আমার ছোট বোনও রয়েছে। দরিদ্র বাবা-মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটাতে এবং তাদের কষ্ট দূর করতে আমরা দু’বোনই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, আমি উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। একজন স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজ করতে চাই। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি কলেজের একজন দক্ষ, আদর্শ ও মানবিক শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখি।
জানি, আমাদের পথটা সহজ নয়। তবুও শত অভাব-অনটনের মধ্যেও স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার এই স্বপ্ন পূরণে সবার সহযোগিতা ও দোয়া চাই।
মল্লিকার ছোট বোন মেঘলা খাতুনও তার স্বপ্ন পূরণে সবার সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন।
মল্লিকার মা আকলীমা বলেন, আমার স্বামী একজন দিনমজুর। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি অসুস্থ থাকায় এখন আর কোনো কাজ করতে পারেন না। আমাদের কোনো জমিজমা নেই, মাত্র সাত শতক জমির ওপর ছোট্ট একটি বাড়িই আমাদের একমাত্র সম্বল।
বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি দোকানে চা-বিস্কুট বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি।
অভাব-অনটনের মাঝেও আমার প্রতিবন্ধী মেয়ে মল্লিকার স্বপ্ন পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো।
ছোটবেলা থেকেই তার স্কুলে যাওয়া ও পড়াশোনার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। তাই শত কষ্টের মধ্যেও আমরা তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি। সে হয়তো খুব বেশি মেধাবী নয়, কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সেই চেষ্টার ফলেই সে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৪৬ অর্জন করেছে।
আমার স্বপ্ন, মল্লিকা পড়ালেখা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে। আমি সবার কাছে আমার মেয়ের জন্য দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করছি, সে যেন এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে।
ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম রিজু বলেন, মল্লিকা অন্য শিক্ষার্থীদের মতো স্বাভাবিক নয়। তবে তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ প্রশংসনীয়। সে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে আমাদের কলেজে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সে বিএমটি বিভাগের প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মল্লিকার পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা থাকলে সে আরও ভালো কিছু করতে পারত। আমরা প্রত্যাশা করি, মল্লিকার স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে এবং সে জীবনে সফলতা অর্জন করবে বলে আমার বিশ্বাস।
সাইফুল রহমান সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব মো: জাকির হোসেন জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই তাকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়। মল্লিকা প্রতিবন্ধী হলেও সে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতোই নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।মল্লিকার এই অদম্য প্রত্যয় অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। সেই সাথে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক এই প্রত্যাশাও করছি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )