
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)’র কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত রায়হান মিয়াকে ফাইল প্রতি দিতে হয় । রায়হান মিয়ার চায়ের নামে সেই ঘুষের মাত্রাটা দিন দিন বেড়েই চলছে। ৫ আগস্টের পর দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যপক পরিবর্তনের কারণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও নিজের দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উপজেলার সকল স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
এ কারণে প্রতিমাসে শিক্ষক-কর্মচারীদের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (এমপিও) বেতন স্বাক্ষর করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। বিল স্বাক্ষরের জন্য ফাইল জমা নেন অফিস সহকারী রায়হান। পরে সুবিধামতো সময়ে ইউএনও স্বাক্ষর করেন। কিন্তু অফিস সহকারী রায়হান টাকা নিয়ে পরের ফাইল আগে এবং টাকা না পেলে নানা অজুহাতে ঘুরাতে থাকেন। এভাবেই হয়রানি ও চা খাওয়ার নামে ঘুষ নেন অফিস সহকারী রায়হান। এবার তার ঘুষের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে এক বিধবা নারীকে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর দেওয়ার নামে টাকা নেওয়াকে কেন্দ্র করে। অবশ্য রায়হান স্বীকার করে বলেন, তেমন চাওয়া পাওয়া নাই। মিঠাপুকুরে এমনো লোক আছে দিনে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ইনকাম করে। আমিতো তার (বিধবা নারী) কাছে চেয়ে টাকা নেইনি। ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পর ওই মহিলা খুশি হয়ে দুই দফায় বিশ হাজার টাকা চা খাওয়ার জন্য দিয়েছিলো। আমি কাজ করে দএজন্য অনেকে খুশি হয়ে এক দুই হাজার টাকা চা খাওয়ার জন্য দেয়।
বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে , উপজেলার বাতাসন লতিবপুর গ্রামের মৃত রজব উদ্দিনের স্ত্রী কহিনুর বেগম ও তার ছেলের স্ত্রী বানেছা বেগম গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ চেয়ে গত ১০ আগস্ট ২০২৩ সালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর দুইটি আবেদন করেন। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ মিঠাপুকুর ইউএনও অফিস সহকারী রায়হান আবেদন কপি থেকে ভুক্তভোগী বিধবা মহিলা কহিনুরের নাম্বারে ফোন করে খরচের কথা বলে দুই দফায় ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন। এরপর কহিনুর ও বানেছা বেগম ঘর বরাদ্দ পেয়েছে এই কথা জানিয়ে দুইটি ঘরের কথা বলে দুই দফায় আরোও ২০ হাজার টাকা নেন। এদিকে দীর্ঘদিন পর উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের ভক্তিপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ পায় বিধবা কহিনুর বেওয়া (৭০)। কিন্তু ঘরে উঠার আগেই আশ্রয়ন প্রকল্পের আশেপাশের স্থানীয় ব্যক্তিরা ঘর দখল করে রাখয় তার ঘরে উঠা হয়নি। একদিকে সুূদ কারবারির কাছে নেয়া টাকার সুদের চাপ অন্যদিকে বরাদ্দ পাওয়া ঘরে উঠতে না পাওয়ায় টাকা ফেরত পেতে স্থানীয় এক নেতার মধ্যস্থতায় ১৩,০০০ টাকা ফেরত পেলেও বাকি ১২,০০০ টাকা ফেরত পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বিধবা এই বৃদ্ধা নারী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রতিষ্ঠান প্রধান জানান, প্রতিমাসে এমপিও অর্ডার আসতে ৭-৮ তারিখ পার হয়ে যায়। তারপর বিল রেডি করে ইউএনও স্যারের স্বাক্ষরের জন্য গিয়ে সেখানেও হয়রানি। যারা অফিস সহকারী রায়হানকে টাকা দেন তাদের ফাইল সহজেই মিলে আর যার টাকা দিতে পারেনা তাদের ৩-৪ দিন ঘুরতে হয়। এভাবেই আমাদের হয়রানির স্বীকার হতে হয়। মিঠাপুকুরের রাণীপুকুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তসিলদার মেহফুজ আল রেজা জানান, এসিল্যান্ড স্যারের নির্দেশে রাণীপুকুর ইউনিয়নের ভক্তিপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে বৃদ্ধা কহিনুরকে ঘরে উঠিয়ে দেয়ার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি যাওয়ার পর সেখানে বসবাসকারীরা ঘর তালাবদ্ধ করে চলে যাওয়ায় অবৈধ বসবাসকারী চিহ্নিত করে ঘর বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয়নি।
এবিষয়ে অভিযুক্ত রায়হান মিয়া বলেন, আমি ২৫ হাজার টাকা নেইনি। ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পর অই মহিলা খুশি হয়ে ২০ হাজর টাকা দিয়েছিলো চা খাওয়ার জন্য। চেয়ারম্যান মেম্বারেরা তো একটা করি ঘরের জন্য ৩০/৪০ হাজার করি টাকা নিয়েছে। ওই মহিলা ঘরে উঠতে না পারায় স্থানীয় এক নেতার মাধ্যমে ১৩ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছি। তার সঙ্গে আমার আর কোন ঝামেলা নেই। মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিকাশ চন্দ্র বর্মণ বলেন, মিঠাপুকুরে আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেয়ার নামে ঘুষ গ্রহণের কোন সুযোগ নেই। কেউ যদি কোন অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Related