
ছোটবেলা থেকে কৃষক হেমন্ত চন্দ্র বর্মণ প্রকৃতি ভালোবাসেন। গাছ-গাছালি নিয়ে মেতে থাকেন। সেই গাছ-গাছালি হয়ে ওঠেছে তার জীবন ও জীবিকার অংশ। নিজের ২০ বিঘা ও অন্যদের কাছ থেকে ৪০ বিঘা জায়গা বন্দোবস্ত নিয়ে গড়ে তুলেছেন ৬০ বিঘার বিশাল নার্সারি। তিলে তিলে গড়ে ওঠা তার সেই স্বপ্নের নার্সারির নাম ‘শান্ত নার্সারি’। রংপুরের নানা অঞ্চলে তার নার্সারির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের নানা জায়গায় তার নার্সারির গাছ বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিক্রি করে তিনি যেমন সাবলম্বী হয়েছেন, তেমনই রংপুর অঞ্চলসহ উত্তরাঞ্চল সবুজায়নে ভূমিকা রাখছেন। আলোকিত করেছেন তার নার্সারিতে কর্মরত বহু যুবককে। এমনি একটি নার্সারি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার গোবড়াপাড়া গ্রামে। ওই গ্রামের হেমন্ত চন্দ্র বর্মণ এ নার্সারি গড়ে তুলেছেন।
হেমন্ত চন্দ্র বর্মণের শুরুটা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সকল শিক্ষার্থীকে একটি করে চারা গাছ দিয়েছিল। এসময় শিক্ষকরা গাছের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উপকারিতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিয়েছিলেন। ছোট্ট বয়সে শিক্ষকদের সেই উপদেশ তার মনে গেঁথে গিয়েছিল। চারাটি বাড়িতে নিয়ে এসে রোপন করেন। সেই ১৯৯০ সালের কথা। তারপর থেকে যখনই যেখানে গাছের চারা পেয়েছেন পরিবেশ রক্ষায় বাড়ির আশেপাশে রোপন করেছেন। বসত ভিটায় চারা রোপন শেষে ১৯৯৪ সালে নিজের জমিতে ‘শান্ত নার্সারি’ গড়ে তোলেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে জেলা পর্যায়ে (গ্রাম্য খামার বনায়ন প্রকল্প) সেরা নার্সারির পুরষ্কার পেয়ে যান। তারপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি হেমন্ত বর্মণকে। বর্তমানে তার ৬০ বিঘা জমিতে নার্সারি রয়েছে। নিজের রয়েছে ২০ বিঘা। অন্যদের জমি ইজারা (লিজ) নিয়েছেন ৪০ বিঘা। প্রায় ১০ লাখ পরিমাণ বিভিন্ন প্রজাতির চারা গাছ রয়েছে তার নার্সারিতে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক মাসিক হিসেবে কাজ করছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ট্রাক যোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় চারা সরবরাহ করা হচ্ছে তার নার্সারি থেকে।
বর্তমানে নার্সারি গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে গোবরাপাড়া গ্রাম। গত ১০ বছর থেকে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে আসছে শান্ত নার্সারি। স্বাবলম্বী হওয়া হেমন্ত চন্দ্র বর্মণ এখন বেকার যুবকদের অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছেন। তার দেখাদেখি ওই গ্রামটিতে এখন ছোট বড় প্রায় ২০টি নার্সারি গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এসে ট্রাকে করে চারা নিয়ে যান। প্রতিদিন গ্রামটিতে দেশের অন্যত্র চারা পরিবহনের জন্য ৫ থেকে ৭টি ট্রাক আসে। এছাড়া ভ্যান, রিকশা ও ট্রলি যোগে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চারা নিয়ে গিয়ে হাট-বাজারে বিক্রি করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে শান্ত নার্সারি। নার্সারিতে প্রায় ৩৩ থেকে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শ্রমিকের পাশাপাশি নার্সারির মালিক হেমন্ত চন্দ্র বর্মণ নিজেও বিভিন্ন চারা গাছের পরিচর্যা করছেন। ট্রাক যোগে বিভিন্ন জেলায় চারা পাঠানোর জন্য অনেকে চারা গাছ ট্রাকে তুলছেন।
ওই নার্সারির শ্রমিক রবীন্দ্র চন্দ্র বলেন, ‘আমরা প্রায় ৩০/৪০ জন শ্রমিক মাসিক ৯ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকায় কাজ করছি। আমরা একসময় বছরে বেশীর ভাগ সময় বেকার থাকতাম। এ নার্সারির কল্যাণে সারা বছর এখন আমারের হাতে কাজ থাকছে।’
নার্সারির উদ্যোক্তা হেমন্ত চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর আগে আমি নার্সারি গড়ে তুলি। বর্তমানে ৬০ বিঘা জমিতে আমার নার্সারি রয়েছে। বার্ষিক প্রায় ১০-১২ লাখ টাকা আয় হয় নার্সারি থেকে। নার্সারি একটি লাভজনক ব্যবসা। গাছ যেমন পরিবেশ বাঁচায়। আবার অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী করে। বাজারে প্রচুর চারা গাছের চাহিদা রয়েছে। আমি চাই চাহিদা পূরণে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হোক।’
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আহসানুল হক বলেন, ‘এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ নার্সারিগুলোর মধ্যে অন্যতম শান্ত নার্সারি। ওই নার্সারিতে অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সম্ভাবনাময় এ খাতকে বড় করতে কৃষি অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষিবিভাগ থেকে নার্সারির উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। মেলায় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ থেকে নার্সারির সফল উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করা হয়।’
Related