


রংপুরের পীরগাছায় সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে একটি বিদ্যালয়ের ৮ নম্বর জুনিয়র সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সরেজমিনে পরিদর্শনের পর অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসায় পরিপত্র অনুযায়ী বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন ইউএনও। এদিকে পদ ধরে রাখতে এবার ইউএনওর বিরুদ্ধেই চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন সেই জুনিয়র শিক্ষক। তবে অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন ইউএনও।
ঘটনাটি ঘটেছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পাঠক শিকড় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার পাঠক শিকড় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র রায় ২০২৩ সালের ৫ জুলাই চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হলে সহকারী প্রধান শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করবেন। ওই প্রতিষ্ঠানে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নাজমা খাতুন বিদ্যমান থাকলেও সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বিদ্যালয়ের ৮ নম্বর জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মোশারফ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়।
অথচ সে সময়ে হাইকোর্টের রায়ে ম্যানেজিং কমিটি অবৈধ ছিল। তাই অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন ইউএনও নাজমুল হক সুমন বিষয়টি নিয়ে কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেননি বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে প্রধান শিক্ষক নিয়মবহির্ভূতভাবে জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মোশারফ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদান করেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যান সদ্য বিদায়ী ইউএনও শেখ মো. রাসেল। সে সময় তিনি বিদ্যালয়ে ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত করেন। এ কারণে ১৬ অক্টোবর তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। ২৬ অক্টোবর কারণ দর্শানোর জবাব দেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোশারফ হোসেন। তবে তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ২৭ নভেম্বর তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে জ্যেষ্ঠতম আগ্রহী শিক্ষককে দায়িত্ব প্রদানের নির্দেশ দেন ইউএনও।
৩০ নভেম্বর ইউএনও শেখ মো. রাসেল বদলিজনিত কারণে বিদায় নিলে নতুন ইউএনও হিসেবে যোগ দেন দেবাশীষ বসাক। তিনি বর্তমানে পাঠক শিকড় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাই জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে সব শিক্ষকের তথ্য চেয়েছেন ইউএনও।
এদিকে বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অনিল চন্দ্র সরকার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহী হওয়ায় তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। অনিল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমি বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। আমি আগেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি। পরিপত্র অনুযায়ী আমারই দায়িত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু নিয়ম ভেঙে জুনিয়র শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাকে ভাড়াটে লোকজন দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি বেতনভাতা বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক রেজাউল করিম রেজা বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। পদ ধরে রাখতে মোশারফ হোসেন ইউএনওর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে তথ্য দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোশারফ হোসেন বলেন, গত ১৩ জানুয়ারি ইউএনও মহোদয় আমাকে তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। সেখানে আমাকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং আমার নিয়োগের বৈধতা ও বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়।
তবে চাপ প্রয়োগের বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করে পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। অনিল চন্দ্রের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে নোটিশ দিয়ে ডাকা হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে প্রথম এমপিওভুক্তিসহ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগের কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’