


খাল কাটা জরুরী এই জন্য যে বাংলাদেশের সকল খাল ভরাট হয়ে গেছে। এমনটি বর্ষার মৌসুমেও খরা হয় অনেক জায়গায় পানি অভাবে চাষাবাদ করা যায় না। আমরা এই বর্ষার পানিটাকে কৃষিকাজে ব্যবহার করতে চাই। উজানের সময় যে পাওয়া যাবে সেটাকে ধরে রাখতে চাই। যাতে শুষ্ক মৌসুম এবং বর্ষা মৌসুম দুইভাবেই কৃষকরা উপকৃত হয়। সমগ্র বাংলাদেশের কৃষক উপকারে আগামী ৫ বছরে দেশের ২০হাজার কিলোমিটার খাল খনন করবো। যেটা আজ সাহাপাড়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একযোগে দেশের ৫৪টি খালের খনন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
উদ্বোধন শেষে তিনি খালের পাড়ে একটি বৃক্ষ রোপণ করেন। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরের সাহাপাড়ায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাহাপাড়া খালটির দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই খালটির সঙ্গে পুনর্ভবা নদীর সংযোগ রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা এই নদীর জলস্রোত ঠাকুরগাঁও হয়ে দিনাজপুরে প্রবেশ করেছে, যা পঞ্চগড়ের মহানন্দা নদীতে গিয়ে মিশেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি দল করি যেই দলের কাজ হচ্ছে সেই কাজগুলো করা যে কাজগুলো করলে মানুষের উপকার হয়। যে কাজগুলো করলে মানুষ খুশি হবে। আমরা চেষ্টা করি সেই কাজগুলো করতে এবং সেই কারনেই আজ আমরা একত্রিত হয়েছি এই সাহাপাড়া খালটি পুন:খননের কাজ শুরু করেছি। এই খালটি প্রায় ১২কিলোমিটার লম্বা। যখন সম্পূর্ণভাবে কাজ শেষ করতে পারব তখন ৩১হাজার কৃষক এখান থেকে পানি নিয়ে ১২’শ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনতে পারবে। সাড়ে তিন লাখ মানুষ এই খালের পানির সুবিধা পাবে। শুধু তাই নয়, এই এলাকার কৃষক ভাইবোনোর এখন যা ফসল উৎপাদন হচ্ছে তার থেকে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিকটন বেশি ফসল উৎপাদন হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কৃষকের পাশে থাকতে চাই। আমরা নির্বাচনী ওয়াদা করেছিলাম ভোটে জয়লাভ করলে ১০হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেবার ওয়াদা করেছিলাম। সরকার গঠনের পরে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিএনপি কৃষকের কথা মনে রেখেছে। সেই বৈঠকে কৃষিঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করেছি।
কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিরাট দেশ। ২০ কোটি মানুষের বসবাস এই দেশে। এত মানুষের জন্য খাবার দাবার বিদেশ থেকে কি আনা সম্ভব। এই খাবার আমাদেরকে এই দেশেই উৎপাদন করতে হবে। বিশেষ করে ধান-চালসহ মৌলিক খাবারগুলো এই দেশে উৎপাদন করতে হবে। আমাদের দেশের মাটি উর্বর। শুধু খাল নয় খালের দুইপাশে ৬০হাজার বৃক্ষরোপন করা হবে। খালের দুই পাশে চলাচলের জন্য রাস্তা করে দেওয়া হবে।
খালে পানি না থাকায় আমাদেরকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে যতটুকু গভীরতায় পানি পাওয়া যায় এখন পানি পেতে আরও বেশি গভীরতা প্রয়োজন হয়। ৫০ –৩০০ওই পানি কমে গেলে আমাদের সকলকে বিপদে পড়তে হবে। এজন্য মাটির উপরের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য মাটির গভীরের পানি রেখে দেওয়া যায়। খাল-নদী খনন করে আমাদেরকে সেই পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
নির্বাচনী ওয়াদায় আমরা ৪কোটি পরিবারকে ফ্যামিলী কার্ড পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। আমরা এরইমধ্যে সেই কাজটি শুরু করেছি। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এরইমধ্যে ৩৭হাজার মা-বোনের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। ধীরেধীরে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রংপুর অঞ্চলের সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। একটু সময় লাগছে। সরকারের বয়স মাত্র ১ মাস।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হবার কারনে স্বাভাবিকভাবেই দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে। তারপরে আমরা যে ওয়াদা করেছিলাম সেই কাজগুলো শুরু করেছি। কৃষক ভাইদের জন্য যেভাবে সুদ মওকুফ করেছি, মা-বোনদেরকে ফ্যামিলী কার্ড দিয়েছি একইভাবে কৃষকভাইদেরকে কৃষি কার্ড পৌঁছে দেবো। যা আগামী মাস থেকে চালু হবে। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক ও মধ্যম চাষীদের কাছে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। যাতে করে এই কার্ডের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিধা পেতে পারেন। বিএনপি সরকার হচ্ছে কৃষকের বন্ধু। কৃষক ভালো থাকলে কৃষাণী ভালো থাকলে বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে।বাংলাদেশের কৃষিকে আমরা শক্তিশালী ভিত্তির উপরে গড়ে তুলতে চাই।
উত্তরাঞ্চল হচ্ছে কৃষি প্রধান এলাকা। বাংলাদেশে অনেক বড় বড় কোম্পানী আছে যারা কৃষি সংক্রান্ত দ্রব্য নিয়ে মিল-কারখানা করেছে। আমরা এরইমধ্যে তাদের সাথে কথা বলেছি, এই এলাকায় কি কি কৃষি নির্ভর মিল-কারখানা গড়ে তোলা যায়। যাতে করে এখানকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই হচ্ছে বিএপির রাজনীতি। আমরা এমনকাজ করতে চাই যেখানে প্রত্যেকের আয় দুই চার বছরে দ্বিগুন হয়ে যায়। এটাই হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি।
তিনি বলেন, এই দেশের মানুষই ৭১ সালে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলো, ২০২৪ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার বিদায় করেছিলো। কাজেই এই দেশের মানুষই শহীদ জিয়ার সময়ে খাল খননের মাধ্যমে দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদেশে রপ্তানী করেছিলো। এই দেশের মানুষই সুন্দর আগামী গড়ে তুলবে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনা। আর সজাগ থাকতে হবে। যারা বিভিন্ন রকম কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা করতে চায়। মিষ্টি কথা বলে বিভ্রান্ত করতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা, মা-বোনদেরকে সাবলম্বী করে তোলা, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে দেশের মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা, ভবিষৎ প্রজন্মকে মানুষ করে গড়ে তোলা। মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এই কাজ করতে হলে আমরা একা পারবো না। জনগনকে সাথে লাগবে। নির্বাচনের সময় যেমন সমর্থন দিয়েছেন ঠিক সেভাবেে এখনো আপনাদের সমর্থন ছাড়া দেশ উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেজন্য দেশের মালিক আপনারা জনগন। মালিক সাথে থাকলে আমরা যে কোন পরিকল্পনা সফল করতে পারবো।
তিনি বলেন, এই খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে আজকে দেশ গড়ার কর্মসূচি শুরু হলো। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই যেই বাংলাদেশের মানুষ তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। এই কর্মসূচি কতটুকু সফল হলো খোজ রাখবো এবং খাল খনন সম্পন্ন হলে দেখতে আবার আসবো।
জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত থেকে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর সদর-৩ আাসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, বোচাগঞ্জ-বিরল আসনের সংসদ সদস্য সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, প্রকল্প এলাকার বীরগঞ্জ-কাহারোল আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জরুল ইসলাম প্রমূখ।
এর আগে, কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৯টায় একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সৈয়দপুর পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে কর্মসূচিস্থল দিনাজপুরে যান তিনি।
উল্লেখ্য প্রধানমন্ত্রী বিকেল সাড়ে তিনটায় দিনাজপুর শহরস্থ ফরিদপুর কবরস্থানে নানা-নানীসহ নিকটাত্মীয়দের কবর জিয়ারত করবেন। বিকেল পাঁচটায় শহরের গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে দিনাজপুরের সূধী সমাবেশ ও ইফতার এবং দোয়া মাহফিলে অংশ নেবেন। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় দিনাজপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করেন প্রধানমন্ত্রী ।