২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাত ছিল দাসিয়ারছড়াসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ছিটমহলবাসীর জন্য মুক্তির রাত। ওই রাতেই অবসান ঘটে দীর্ঘ ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের।
ছিটমহল বিনিময়ের পর গত ১১ বছরে দাসিয়ারছড়ায় লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, ভূমির রেকর্ড, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছেন এখানকার মানুষ। সম্প্রতি ছিটমহলের চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষা খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবারের সদস্য পেয়েছেন সরকারি-বেসরকারি চাকরি। ফলে ধীরে ধীরে বদলে গেছে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা।
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আলোকে ছিটমহল বিনিময়ের পর অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়েছে সাবেক ছিটমহলবাসীর।
১১১টি ছিটমহলের মধ্যে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া ছিল সবচেয়ে বড়। ছিটমহল আন্দোলনের সময় এখান থেকেই গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। বিনিময়ের পর দাসিয়ারছড়াকে তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে বিভক্ত করা হয়। এর বড় অংশ ফুলবাড়ী ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হলেও কিছু অংশ কাশিপুর ও ভাঙামোড় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ছিটমহল বিনিময় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতে যুক্ত হয়। ভারতের ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড় জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। এর মধ্যে ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া সবচেয়ে বড়। এর আয়তন ১ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর। এখানকার ৬ হাজার ৫২৯ জন বাসিন্দা বাংলাদেশি নাগরিকত্ব লাভ করেন।
ছিটমহল বিনিময়ের আগে এসব এলাকায় ছিল না স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ। ছিল না পর্যাপ্ত শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কিংবা চলাচলের ভালো রাস্তা। আধুনিক ঘরবাড়ি ছিল অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। এমনকি পরিচয় গোপন করে অনেক বাসিন্দা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতেন এবং জন্মনিবন্ধনসহ নানা নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করতেন।
দাসিয়ারছড়ার সমন্বয়পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর ইসলাম বলেন, “আমরা এবার এমপিওভুক্ত হয়েছি। বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী অন্য ইউনিয়নের। আগে এখানকার শিক্ষার্থীদের পরিচয় গোপন করে অন্য ইউনিয়নে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হতো। এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই।”
দাসিয়ারছড়ার সার ও বীজ ঘরের স্বত্বাধিকারী খড়িয়াটারী গ্রামের আকবর আলী বলেন, “ছিটমহল বিনিময়ের পর বিএডিসির ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। সরাসরি সার ও বীজ এনে কালিহাট বাজারে বিক্রি করছি। দাসিয়ারছড়ার কৃষকেরা এখন সহজেই এখান থেকে সার ও বীজ সংগ্রহ করতে পারছেন।”
দাসিয়ারছড়ার বালাটারী ও জুলাটারী গ্রামের বাসিন্দা আছমা বেগম ও লায়েফ আলী বলেন, “আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি। কিন্তু একটি জিনিস এখনো পাইনি—দাসিয়ারছড়া ইউনিয়ন। নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দাসিয়ারছড়াকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ঘোষণা করা হোক। এটি হলে আমাদের আর তেমন কোনো চাওয়া থাকবে না।” বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, “দাসিয়ারছড়ায় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছেন।
গত কয়েক বছরে এখানে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এখন দাসিয়ারছড়াবাসীর প্রাণের দাবি হলো, এটিকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন হিসেবে গেজেট ঘোষণা করা। বিএনপি সরকারের কাছে এ ছিটমহলবাসী সেই আশায় বুক বেঁধে আছে। স্বতন্ত্র ইউনিয়ন হলে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষ সরাসরি বিভিন্ন সরকারি সেবা পাবে এবং দ্রুত বদলে যাবে তাদের জীবনযাত্রার মান।”
ছিটমহল বিনিময়ের এক যুগের দ্বারপ্রান্তে এসে দাসিয়ারছড়াবাসীর চোখে এখন আর অবরুদ্ধ জীবনের অন্ধকার নেই। শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও নাগরিক সুবিধার বিস্তারে বদলে গেছে তাদের জীবন। তবে উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতার মধ্যেও স্বতন্ত্র ইউনিয়ন গঠনের দাবি এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।