


কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ধান দেয়ার কৃষকের তালিকায় নাম উঠেছে দরিদ্র, ভূমিহীন, দিনমুজুরসহ অকৃষকের নাম। অভিযোগ রয়েছে এসব অকৃষকের নাম তালিকাভূক্ত করেছে একটি চক্র। যারা এসব নামের বিপরীতে গুদামে ধান দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত কৃষক। এমন অনিয়মের বিষয়ে একে অন্যের উপর দায় চাপাচ্ছে উপজেলা খাদ্য ও কৃষি বিভাগ।
নাগেশ্বরী উপজেলায় এবার ইরি বোরো মৌসুমে ৮০৭জন প্রকৃত কৃষকদের নিকট থেকে প্রতি মেট্রিক টন ৩৬হাজার টাকা দরে ২’হাজার ৪২৩ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের টার্গেটে নির্ধারণ করা হয়।সেই মোতাবেক প্রকৃত কৃষকদের নিকট থেকে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদন প্রকৃয়ায় একটি চক্র বিভিন্ন ভাতা করে দেয়ার কথা বলে দরিদ্র, ভূমিহীন, দিনমুজুর শ্রেণীর লোকজনের নাম ব্যবহার করে প্রায় ১হাজার জনের নামে আবেদন করে। আবেদন শেষে লোক দেখানো লটারীর মাধ্যমে কৃষক বাছাই করে ক্রয় কমিটি। বাছাইকৃত কৃষকের অর্ধেকের বেশী অকৃষকের নাম অন্তভুক্ত করে তালিকা প্রকাশ করে কমিটি। এই তালিকায় থাকা অনেকেই জানেনা তাদের নাম অন্তর্ভূক্তি হয়েছে। পরে সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের ব্যাংকে নিয়ে গিয়ে এ্যাকাউন্ট খুলে ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকা দিয়ে তাদের বিদায় করে। অপর দিকে তাদের নামে গুদামে ধান দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় সিন্ডিকেট সদস্যরা।
অনুসন্ধানে নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নে এক ছাটবাড়ি গ্রামের ১৬ জন ভুয়া কৃষকের সন্ধান পাওয়া যায়। সবাই হতদরিদ্র, নিজের কোন আবাদি জমিজমা নেই। তারপরও সরকারের খাতায় কৃষক খাদ্য গুদামে। গুদামে ধান দিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকাও উত্তোলন করেছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, এলাকার সিন্ডিকেট সদস্য দুলাল মিয়া এসব অসহায় মানুষের কৃষি কার্ড, বিধবা কার্ড, ভিজিডি কার্ড সহ বিভিন্ন সরকারী সহায়তার লোভ দেখিয়ে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে ফাকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে বলে কাজ হয়েছে বাড়ি যাও। পরে জনপ্রতি গড়ে এক হাজার থেকে ২ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করে। এতথ্য ফাঁস হয়ে গেলে দরিদ্র এ মানুষ গুলো পুলিশ ও আইনী ঝামেলার কথা ভেবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।
এদেরর মধ্যে রথের স্ত্রী বিষ্ণুমরী, মৃত আজগর আলীর পুত্র জমির উদ্দিন,গোলজারের স্ত্রী রাজিনা খাতুন, বাবলু মিয়ার স্ত্রী ফরিদা বেগম, আবু বক্কর সিদ্দিকীকের স্ত্রী হাজেরা বেগম, জতিশের স্ত্রী মনোবালা, আসমত আলীর স্ত্রী শিরিনা, গোলাপ উদ্দিনের স্ত্রী আছিয়া বেগম, বক্করের স্ত্রী গোলভান বেগম এবং নাভজান বেওয়াসহ অনেকের চেকের দুটি করে পাতা নিয়েছে দুলাল মিয়া।
নাভজান বেওয়া বলেন, তিন বছর আগে তার স্বামী মারা গেছেন। বাড়িভিটে ১৫ শতক জমি ছাড়া আর কোন জমি নেই। অন্যের বাড়িতে কাজ করে পেট চলে। বিধবা ভাতা দেয়ার কথা বলে দুলাল ব্যাংকে নিয়ে যায়। এরপর অনেক সই নেয় ব্যাংকের লোক, একটা বই দেয়। ঐ বই থেকে সই করা দুটা চেকের পাতা দুলাল নিয়ে দু দফায় পনেরশ টাকা দিছে।
আছিয়া বলেন,ব্যাংকে সই নিয়ে বাইরে পান খাইতে পাঠায় দিছে। পরে ওমরা চেক দিয়া টাকা তুলছে। বাড়িতে আসি এক হাজার টাকা দিছে। গোলভান বেগম বলেন, কৃষি কার্ডের কথা বলে ছবি আর আইডি কার্ড নিয়ে কম্পিউটারে নাম দেয় দুলালসহ দুজন ব্যক্তি। পরে ব্যাংকে নিয়ে যায়। কি করছে জানিনা। দুলাল আর ব্যাংকের ম্যানেজার জানে। পরে আমাকে দেড় হাজার টাকা দিছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমানের দাবী তিনি বছরে ৩০০/৪০০ মণ ধান উৎপাদন করেন। অথচ আজ পর্যন্ত সরকারের গুদাম কখনো ধান দিতে পারেননি। তার অভিযোগ-প্রকৃত কৃষক বাদ দিয়ে দরিদ্র মানুষের নাম দিয়ে ধান দেয়ার সুবিধা নিয়ে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট সদস্যরা।
অভিযুক্ত দুলাল মিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, খোঁজখবর নেন শুধু কচাকাটায় নয় নাগেশ্বরী উপজেলার সকল ইউনিয়নে কোথাও কৃষক ধান দেয় নাই। ধান ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে। তবে তিনি দাবী করেন, আর্থিক কোন সুবিধা না নিয়ে তিনি প্রভাবশালী মহলের বড় ভাইদের নির্দেশ পালন করেছেন মাত্র।
নাগেশ্বরী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাউছার হাবিব নিজের দায় অস্বীকার করেন। কৃষি বিভাগ এবং ব্যাংকের দিকে তিনি আঙ্গুল তোলেন। উপজেলা খাদ্য বিভাগের এ কর্মকর্তা বলেন,এমন কোন ঘটনা ঘটেনি। কৃষি বিভাগ হতে দেয়া কৃষকের তালিকা হতে লটারীর মাধ্যমে কৃষক নির্বাচিত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেরে দাবী স্বল্প সময়ে আবেদনকারী কৃষকদের যাচাইবাছাই সম্ভব নয়। তবে কৃষক নয় এমন ব্যাক্তির নাম অন্তভূক্ত হলেও তারা ধান দিতে পারবেন না। এসব নাম বাতিল করে আবার লটারী দেয়ার নিয়ম আছে। তবে খাদ্য বিভাগ এসব বিষয়ে আমাদের সাথে সম্নয় করেননি। কাদের নিকট থেকে ধান সংগ্রহ করছে এটা আমাদের জানা নেই।
নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ মৌসুমে ৮ কোটি ৭২ লাখ ২৮ হাজার টাকার ধান সংগ্রহ করা হবে। আগামী ৩১ আগষ্ট পর্যন্ত চলবে এই সংগ্রহ।