1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
গ্রামীণ ঐতিহ্য থেকে বিস্মৃতির পথে পাতা খেলা | দৈনিক সকালের বাণী
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৪ অপরাহ্ন

গ্রামীণ ঐতিহ্য থেকে বিস্মৃতির পথে পাতা খেলা

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
  • আপলোডের সময় : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২১ জন দেখেছেন

একসময় পাতা খেলার আয়োজন মানেই ছিল গ্রামে উৎসবের আমেজ। মাঠের চারপাশে জড়ো হতেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। ঢোলের বাদ্য, দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর প্রতিযোগীদের উত্তেজনায় মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে আসতেন এই খেলা দেখতে।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। আধুনিক বিনোদন, প্রযুক্তির বিস্তার ও নিয়মিত আয়োজনের অভাবে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে গ্রামীণ ঐতিহ্যের পাতা খেলা এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

রোববার (৪ অক্টোবর) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো নিয়মিত পাতা খেলার আয়োজন নেই। দীর্ঘদিন ধরে অনেক এলাকায় এ ধরনের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে কোথাও খেলার আয়োজন করা হলে এখনও দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এতে স্পষ্ট হয়, মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মূল সংকট নিয়মিত আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতার।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই খেলায় মাঠের মাঝখানে কলাগাছ রেখে তন্ত্র-মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের পাতা নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। খেলাটির সঙ্গে স্থানীয় লোকাচার ও গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি যোগসূত্র রয়েছে। এ কারণে এটি শুধু বিনোদন নয়, স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতিরও একটি অংশ বলে মনে করেন সংশি¬ষ্টরা।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, কয়েক দশক আগেও গ্রামীণ জনপদে বিনোদনের সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে পাতা খেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় খেলা ছিল মানুষের অবসর ও আনন্দের অন্যতম মাধ্যম। কোনো এলাকায় খেলার আয়োজন হলে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষও দল বেঁধে সেখানে যেতেন। খেলা উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা বাড়ত, বসত ছোটখাটো মেলা এবং তৈরি হতো সামাজিক মিলনমেলার পরিবেশ।

উপজেলার বেলওয়া গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ পাতা খেলোয়াড় রউফ মেম্বার বলেন, আমাদের সময়ে পাতা খেলা নিয়ে গ্রামে গ্রামে ব্যাপক ধুম ছিল। কয়েকদিন ধরে মাইক দিয়ে প্রচার করা হতো। খেলাকে কেন্দ্র করে বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসতেন। এখন সেই দিন আর নেই।

সিংড়া গ্রামের তরুণ পাতা খেলোয়াড় সাকিব হাসান নাঈম বলেন, বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছি, আগের সময়ে পাতা খেলা মানে ছিল ঈদের আমেজ। এখন কোনো কোনো গ্রামে হঠাৎ করে খেলা হয়। নিয়মিত আয়োজন না থাকায় নতুন প্রজন্ম এই খেলার সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়।

স্থানীয়দের মতে, পাতা খেলার মতো দেশীয় খেলাগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেম শিশু-কিশোরদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ খেলার মাঠ কমে যাওয়া, ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর নিয়ম নতুন প্রজন্মকে শেখানোর উদ্যোগের অভাব এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকায় এসব খেলার চর্চা কমে যাচ্ছে।

সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, ঘোড়াঘাট ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। এখানকার লোকজ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পাতা খেলাসহ হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় খেলাগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হারিয়ে যাওয়ার আগেই পাতা খেলাকে ঘিরে নিয়মিত আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা হবে। মাঠে ফিরবে পুরোনো সেই উৎসবের আমেজ, নতুন প্রজন্ম জানবে নিজেদের লোকজ সংস্কৃতির কথা।

আর এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি খেলা নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও টিকে থাকবে। তারা দাবি জানান, স্থানীয় মেলা, জাতীয় দিবস, বিভিন্ন উৎসব ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পাতা খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে দেশীয় খেলাগুলোর পরিচিতি তুলে ধরলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হবে। এসব খেলার ইতিহাস, নিয়ম ও স্থানীয় বৈশিষ্ট্য লিখিত ও ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করাও জরুরি।

বিষয়টি নিয়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, পাতা খেলাসহ আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের দেশীয় খেলাগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এসব খেলা নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে স্থানীয় মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন দিবসের আয়োজনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নিকট অনুরোধ করবো। তবে স্থানীয় সংগঠন ও তরুণদের উদ্যোগ থাকলে যুব উন্নয়ন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা সহজ হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )