


বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি। গাইবান্ধা-৩ আসন থেকে প্রথমে সংরক্ষিত আসনের এমপি বনে জান সহজেই। এরপর ওই আসনের অবৈধ নির্বাচনে বিজয়ী মো ইউনুস আলী সরকারের মৃত্যুর পরে তিনি আবার এমপি হন। চলতি বছরের নির্বাচনে পুনরায় এমপি হওয়ায় ওই আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। ক্ষমতাশীন দলের টানা এমপি থাকার কারণে হয়ে ওঠেন ডানপিটে।
এর ফলে উম্মে কুলসুম স্মৃতি গড়েছিলেন নিজস্ব বাহিনী। সেই বাহিনী দিয়ে অপরাধ জগতের সব কাজ করতেন। চাঁদার জন্য মানুষের বাড়িতে পাঠাতেন সেই নিজস্ব বাহিনী। তাদের মতের বাহিরে গেলেই জনসমুখ্যে মারপিট করতেন নিরঅপরাধ লোকজনকে।
গাছ কাটা থেকে শুরু করে নিয়োগ পরীক্ষা, এছাড়াও সবখানেই উম্মে কুলসুম স্মৃতির বিশেষ ভাগ বরাদ্দ থাকতো। তার এই বিশেষ বরাদ্দ না থাকলে কোন কাজই আর হতো না। তাই সবাই বাধ্য হয়ে এই বিশেষ বরাদ্দ দিতেন। এলাকায় গড়ে তোলেন অনিয়ম-দুর্নীতির রাজ্য। সেই রাজ্যের রানী হওয়ার সুবাদে পরিবারের লোকজন হয়েছেন কোটি টাকার মালিক। উন্নয়ন কাজ ভাগবণ্টন, কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে এই রানীর বিরুদ্ধে। আওয়ামী সরকার পতনের পর দলীয় এ জনপ্রতিনিধি এখন পর্যন্ত লাপাত্তা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পালানোর কথা এখন লোক মূখের গল্প। এদিকে তাঁর পরিবারের কাছে টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন চাকরি প্রত্যাশিরাসহ অনেক ব্যক্তি।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার জামালপুর গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে উম্মে কুলসুম স্মৃতি। জেনারেল থেকে বিএসসি ও এর সাথে গাইবান্ধা আইন কলেজ থেকে “ল” পাশ করেন। কিছুদিন আইন পেশাও করেছেন তিনি। স্বামী মাহবুবুর রহমান ছিলেন বেকার। নিজেকে অনিয়ম-দুর্নীতির রানী বানাতে বেকার স্বামীকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। স্মৃতি ছাত্র জীবন থেকে কোন রাজনীতি দলের কর্মী বা সমর্থক ছিলেন তা জানেন না স্থানীয়রা। তবে হঠাৎ একদিন স্থানীয়রা জানতে পারেন উম্মে কুলসুম স্মৃতি বাংলাদেশ কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। বহু অর্থ-সম্পদ গড়েছেন। দোচালা টিনের ঘর থেকে পলাশবাড়ী পৌর এলাকায় নির্মাণ করেছেন বিলাশবহুল ভবন। শুধু তাই নয়, দিনাজপুর ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে কিনেছেন শত বিঘা জমি। ঢাকায় রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। দেশের বাহিরে কানাডার বেগম পাড়ায় রয়েছে বাড়ী।
২০২০সালে ২১ মার্চে উপনির্বাচনে উম্মে কুলসুম স্মৃতি সংসদ সদস্য হন। পরে তিনি ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারী আওয়ামী লীগের দলীয় টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তাঁর আচার ব্যবহার কথায় চলে আসে রূঢ়তা। অকারণে মানুষের সঙ্গে করতেন দুর্ব্যবহার। ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি কেউ। ক্ষমতা দিয়ে বিনা ভোটে চাচাতো ভাই গোলাম সারোয়ারকে বানিয়েছিলেন পলাশবাড়ী পৌর মেয়র। ছোট বোনের স্বামী সেকেন্দার আলী রেডিও-টেলিভিশনের মেকার থেকে হয়ে যান তদবীর পাটির প্রধান। আপন ছোট ভাই আমিরুল ইসলাম চাকুরি দেওয়ার কথা বলে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।
নির্বাচনি এলাকায় তিনি উন্নয়নের নামে কামিয়েছেন কোটি টাকা। কমিশন ছাড়া প্রকল্পের কাজে লাকতো নানা ঝামেলা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দপ্তরগুলোতে তাঁর আস্থাভাজন কর্মকর্তা রেখেছেন। দুই উপজেলার বিদ্যালয়ে বিভিন্ন কমিটিতেও ছিল তাঁর অস্থাভাজন লোক। কোথাও চাকরি ও নিয়োগ পরীক্ষা হলেই নয়ছয় করে দু হাতে লুটেছেন কোটি কোটি টাকা। সরকারি নিয়ম মেনে এলাকার কোনো সড়কের গাছ কাটা হলে চাঁদা দিতে হতো তাকে। ঠিকাদারি লাইসেন্স করতে বিভিন্ন দপ্তরে করতেন তদবীর। এ কাজে সহযোগি ছিলেন তার স্বামী। সরকার পতনের পর থেকে এমপি ও তার পরিবারের লোকজন গাঁ ঢাকা দিয়েছে। এমপির ও তাঁর সহযোগীদের নামে হয়েছে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলা।
হরিনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা ভুক্তোভোগি জাহাঙ্গীর কবির হোসাইন বলেন, পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের চারটি রাস্তার দুই পাশে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণ করে হরিনাবাড়ি সমাজকল্যাণ সমিতি। সরকারি বিধি মোতাবেক আমরা গাছ বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করি। পরে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। কিন্তু গাছ কাটা চলমান অবস্থায় সাবেক সংসদ সদস্যে উম্মে কুলসুম স্মৃতির বাহিনী ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তাৎক্ষনিক চাঁদার টাকা না পেয়ে আমাকে মারধর করেন। তারপর একদিন পরই জামালপুর এলাকায় এমপির নিজ বাসায় আমাকে নিয়ে যায়। জীবনের ভয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ফিরে আসি।
রানা মিয়া নামের এক ভুক্তোভোগি বলেন, উম্মে কুলসুম স্মৃতি এমপির ছোট ভাই উপজেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পদক আমিনুল ইসলাম পাপুল আমার কাছে থেকে বরিশাল দ্বি মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে ১০ লক্ষ টাকা নেন। প্রায় চার বছর অতিক্রম হলেও চাকরি হয়নি আমার। টাকা ফেরত চাইলে নানা এমপির ক্ষমতার ভয় দেখায়। সরকার পতনের পর তাদের আর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতারণার মাধ্যমে এমপির ভাই আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও দলীয় অন্যান্য এমপি প্রার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বিগত নির্বাচনে সাবেক এমপি তার ছোট ভাই গোলাম সারোয়ারকে মেয়র বানিয়েছেন ক্ষমতার বলে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বাইরে কাউকে নির্বাচন করতে দেয়নি। যারা রানীর নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্বাচন করেছেন ক্যাডার বাহিনী তাদের ওপর নির্বাচনে হামলা চালিছেন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমপির পছন্দের ব্যক্তি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে সহযোগিতা করেন।
কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতিরা বলেন, এই রানীকে টাকা না দিয়ে কোন কাজই করা যেতো না। প্রতিটা নিয়োগে মোটা অংকের টাকা দেয়া লাগতো। তার হুকুম ও মন জয় করা ছাড়া বাকি সবই ছিলো যেন পাপ। টাকা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না।
একাধীক দলের নেতা কর্মী বলেন, ইউনুস আলী সরকারই এমপি হিসেবে ভালো ছিলেন। হঠাৎ করে কোথা থেকে উড়ে এসে জুরে বসলো এই স্মৃতি। এমপি হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেন। হাতে গনা কয়েকজন নেতা কর্মী ছাড়া বাকিদের তিনি পছন্দ করতেন না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক হন। তার আচরনে নেতা কর্মীসহ বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তারা বিরক্ত।
মনোনয়নপত্র দাখিলের তারিখে অস্থাবর সম্পদের ধরন গুলোর মধ্যে নগদ ২৬,৪৫,৫৪৭ টাকা, ব্যাংকে জমা ছিলো ৯,৮৪,৯৮৮ টাকা, শেয়ার ৭,৪৩,৯৯৮ টাকার, সেভিং ৪৫,০০০০০ টাকা, এফডিআর ১১,৮৬,২৮০ টাকা, জীপ গাড়ীর মূল্য ৭৭,৫০,০০০ টাকা, ৫০ তোলা স্বর্ণের মূল্য ১২,৫০,০০০ টাকা, ফ্রীজ-টিভি-এসি’র মূল্য ৫০,০০০ টাকা, খাট-ওয়ারড্রপ-আলমারী-সোফার মূল্য ৫০,০০০ টাকা সর্বমোট ১৯১৬০৮১৩ টাকার। স্বামীর অস্থাবর সম্পদ ছিলো এফডিআর ৫,০০,০০০ টাকা, জীপ গাড়ী ২০,০০,০০০ টাকা, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ৪০,০০০ টাকা, আসবাবপত্র ৫০,০০০ টাকা এবং ক্যাশ ইন-ক্যাশ এট ব্যাংক-অন্যান্য ডিপোজিট ৯৮,৮৪,৭১৯ টাকা সর্বমোট ১,২৪,৭৪৭১৯ টাকার।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে ১৫,০০,০০০ টাকার একটি বায়নাকৃত এপার্টমেন্ট এবং স্বামীর মৎস্য খাতে ৪৭,০০,০০০ টাকা ও অন্যান্য বিষয়ে ১,৪৭,৭৯,০১১ টাকা দেখানো হয়। অস্থাবর ও স্থাবর এই সম্পদ ও টাকা নাম মাত্র দেখানো হয় নির্বাচনী হলফনামায়।
অনিয়ম-দুর্নীতির রাজ্যের রানী উম্মে কুলসুম স্মৃতির মুঠোফোনে কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।