


দেশের উত্তরের জেলা গাইবান্ধাতে শুরু হয়েছে শীতের তীব্রতা। গত তিনদিন থেকে ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। বইছে হিমেল হাওয়া। তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশায় গাইবান্ধার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের বেলাতেও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিরমত ঘন কুয়াশা পড়ছে। ঝিরঝিরি বাতাস ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত দু’দিন থেকে বৃহস্পতিবার সারাদিন পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। ঘন কুয়াশার কারণে ব্রহ্মপুত্র-যমুনাসহ অন্যান্য নদ-নদীতে নৌযান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে।
দেখা গেছে, জেলাতে সকাল থেকেই কুয়াশায় ছেয়ে থাকে। দুপুরে একটু কুয়াশা হালকা হলেও বিকেলের পর ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় জনপদ। ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে গোটা জনপদ। দিনের শুরুতে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন গুলো হেড লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট করছেন ছিন্নমূল মানুষেরা। নভেম্বর মাসের শেষদিক থেকেই এই জেলায় শীত অনুভুত হচ্ছে। ধীরে ধীরে এর তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে গত এক সপ্তাহ থেকে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১-১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে। শীত নিবারণের জন্য মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আগাম প্রস্তুতি নিলেও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী মানুষগুলো শীতবস্ত্র সংগ্রহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত থাকে জেলার বিভিন্ন এলাকা। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কাজকর্ম কমে আসছে, অন্যদিকে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে গরম কাপড় কিনতে পারছেন না বলে জানান একাধিক শ্রমজীবি মানুষ।
সড়ক ও রেলপথে দিনের বেলায়ও হেডলাইট জ্বালিয়ে মোটর সাইকেল, অটোবাইক, ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহনকে চলাচল করতে হচ্ছে। এদিকে তীব্র ঠাণ্ডায় জমিতে কাজ করতে পারছেন না জেলার কৃষকরা। অব্যাহত ঘন কুয়াশা ও রোদ না থাকায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ক্ষেতের সরিষা ও বোরো ধানের বীজতলা। হলুদ রং ধারণ করছে ধানের চারা এবং সরিষার ফুলের গাছগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে প্রচণ্ড শীতের কারণে ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়ানসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলার সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শীতজনিত রোগ নিয়ে শিশু ও বয়স্ক রোগীরা বেশি আসছে। এছাড়া গরম কাপড়ের অভাবে শীত নিবারণে কষ্ট পাচ্ছেন জেলার ছিন্নমূল মানুষ। ফলে শহরের গরম কাপড়ের মার্কেটগুলোতে নিম্ন আয়ের মানুষরা কেনার জন্য ভীড় জমাচ্ছে।
অপরদিকে হিমেল হাওয়া ও মৃদু শৈত্যপ্রবাহে মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়ছেন খামারিসহ প্রান্তিক কৃষকরা। গবাদিপশু গুলোকে পুরনো কাঁথা, কম্বল, পাটের বস্তা, পুরনো জামা এবং যার যা আছে তাই দিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। তবে সব থেকে বেশি সমস্যায় রয়েছে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের গবাদিপশুগুলো।
সদর উপজেলার হাট লক্ষীপুরের রানা মিয়া (৫৫) মিয়া বলেন, শীতে অবস্থা খুব কাহিল। এরকম ঠান্ডা ও শীত হলে আমার মতো বয়স্ক মানুষগুলোর খুব সমস্যা। এমনিতেই অসুখে চলতে পারিনা। এখন শুধু হাত পা টাটায়।
সদর উপজেলার কিশামত ফলিয়া গ্রামের আসাদ, সাগর মিয়া, পিজন ও সিজু মিয়া বলেন, ঠান্ডায় ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। তিনদিন থেকে সূর্যের দেখা মিলছেনা। এই ঠান্ডায় জমিতে কাজ করতে যেতেও পারছিনা। তাই মাঝে মধ্যে আগুন পোয়াই। তারা আরও বলেন, প্রচন্ড শীত সেই সাথে ঠান্ডা বাতাসে গরু ছাগল নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে শীতের হাত থেকে বাঁচতে গরুর ঘরে পোড় দিয়েছি। এই শীতে মানুষের যেমন কষ্ট হয় তার থেকে বেশি কষ্ট হয় গরু ছাগলের। আমরা তো ঠান্ডা লাগলে বলতে পারি কিন্তু ওরা তো বলতে পারে না। বাস্তার চট তাদের গায়ে দিয়েছি।
রংপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রতিদিনই গাইবান্ধা জেলার তাপমাত্রা কমে আসছে। আজ চলতি শীত মৌসুমের তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ জেলায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তীব্র ঠান্ডা আরও দুই থেকে তিন দিন থাকতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.মাহমুদ আল হাসান জানান, ছিন্নমূল শীতার্ত মানুষদের জন্য উপজেলায় তিন হাজার পিস কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার কম্বল ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণ শুরু করা হয়েছে। বরাদ্দের জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থালোকে শীতবস্ত্র বিতরণের আহবান জানান তিনি।