


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুড়িগ্রাম-১ (নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী) আসনটিতে জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি। দীর্ঘদিন এই আসনটি জাপা ও আওয়ামীলীগের দখলে থাকলেও এবার আসনটি জিততে বিএনপির চার প্রার্থী এখন মাঠে। বিএনপির প্রচুর জনসমর্থন রয়েছে এই আসনে। অপরদিকে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন তাদের প্রার্থী ঘোষনা করেছে। তারাও মাঠে, ঘাটে, হাট-বাজারে জন সংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ২৫ কুড়িগ্রাম-১। এই সংসদীয় এলাকায় ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ১০ টি ইউনিয়ন ও নাগেশ্বরী উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে।
এ দুটি উপজেলার বেশিরভাগ অঞ্চল সীমান্তবর্তী ও নদী বেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল। এখানকার অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি বা ব্যবসা। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসায় জনসাধারণের মাঝে চলছে বিভিন্ন হিসাব- নিকাশ। সাধারণ মানুষ বিগত সংসদ সদস্যদের কাজ কর্ম নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করছেন।
২৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫১ হাজার ৭৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪৪ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩২৯ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ৩ জন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনের ভোটারদের মধ্যেও চলছে ব্যাপক নির্বাচনী আলোচনা ও ভোটের হিসাব নিকাশ।এই এলাকার ভোটার ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের ধারনা জামায়াত ও ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জোট হলে এবং তাদের একক প্রার্থী দিলে বিএনপি বেকায়দায় পড়তে পারে। কারন এই আসনে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। স্বাধীনতার পর এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও ৩য় সংসদ নির্বাচন থেকে দশম সংসদ পর্যন্ত (৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদের ১৫ ফ্রেব্রুয়ারীর নির্বাচন ছাড়া) ছিল জাপার দখলে। এবার আসনটি জিততে এখন মরিয়া বিএনপি। এই আসনে ১৯৯১ সালে জাপা প্রার্থী প্রয়াত আ খ ম শহিদুল ইসলাম বাচ্চু ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং ২০২৪।
সালের জাতীয় নির্বাচনে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আসলাম হোসেন সওদাগর বিজয়ী হন।
এ আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাইফুর রহমান রানা, নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা, জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য কেন্দ্রীয় ড্যাব নেতা ডা. মো. ইউনুছ আলী, জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ড্যাব নেতা ডা. মাহফুজার রহমান মারুফ মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা গেছে। বিএনপির এই চার মনোনয়ন প্রত্যাশী তাদের নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ করছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী হিসেবে সাবেক ছাত্র নেতা সহকারি অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হারিছুল বারী রনির নাম ঘোষণা করেছে। জাকের পার্টির আব্দুল হাই মাষ্টার, গণ অধিকার পরিষদের বিন ইয়ামিন মোল্লা প্রার্থীতা করবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির কোন প্রার্থীর নাম এখনো শোনা যাচ্ছেনা। তবে জাতীয় পার্টি ভোট করতে পারলে তাদের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক ভোটের হিসাব নিকাশ পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন ভোটারেরা। অপরদিকে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জোট হলে আসনটি জিততে দেশের বৃহৎ দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জন্য অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
বিএনপির প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা ১৯৯৬,২০০১,২০০৮ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করে হেরে গেছেন। এবারও তিনি প্রার্থী। বিএনপির চার প্রার্থীর মধ্যে সাইফুর রহমান রানা ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকলেও এ আসনে বিএনপির দুটি সক্রিয় গ্রুপ রয়েছে। একটি সাইফুর রানার গ্রুপ অন্যটি রানা বিরোধী গ্রুপ। দুটি গ্রুপ একত্রিত না হলে ভোটের রাজনীতিতে তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নিতে পারে বলে জানিয়েছে বিএনপির একাধিক সূত্র।
তথ্যমতে, এ আসনে ১৯৯১ সালে জাপা প্রার্থী আ,খ,ম শহীদুল ইসলাম বাচ্চু ১৯৯৬,২০০১ ২০০৮,২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে নৌকা পর থেকে নিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আসলাম হোসেন বিজয়ী হন।
আসনটি ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায়, মাদক ও গবাদি চোরাচালান রোধে জনপ্রতিনিধিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ভূরুঙ্গামারীর একাধিক ইউনিয়ন ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় গবাদি চোরাচালান, মাদক, অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। তরুণদের একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ভোটারদের প্রত্যাশা, দলীয় প্রতীক কিংবা নেতা নয়। প্রয়োজন বাস্তব উন্নয়ন, সমস্যা সমাধানের দিকনির্দেশনা। এমন একজন জনপ্রতিনিধি চান, যিনি দুর্যোগে-দুর্দিনে জনগণের পাশে থাকবেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী সহকারি অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিক বৈষম্যহীন একটি সমাজ কায়েম করতে চায়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আমাদের যাদেরকে দল মনোনয়ন করেছে আমরা সেইসব এলাকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে প্রধান সমস্যাগুলো নির্বাচন করতেছি। তিনি আরো বলেন, কুড়িগ্রাম জেলা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যর শিকার। আমরা ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে কুড়িগ্রাম জেলাকে বৈষম্যমুক্ত করব। আমি প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে কথা বলতেছি। আল্লাহপাক যদি জনগনের খেদমত করার তৌফিক দান করেন, তাহলে আমার আসনে মানুষের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে পর্যায়ক্রমে কাজ করব ইনশাআল্লাহ।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় ড্যাব নেতা ডা. ইউনুছ আলী বলেন,“২৫,কুড়িগ্রাম-১ আসনটি (নাগেশ্বরী-ভুরুঙ্গামারী) ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদী বেষ্টিত। এখানকার বেশিরভাগ ইউনিয়ন চরাঞ্চলভিত্তিক, আর প্রধান সমস্যা হলো নদীভাঙন সাথে কর্মসংস্থানের অভাব আর সীমান্তবর্তী হওয়া মাদকের প্রভাব। এই আসনে আওয়ামী লীগ এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। অথচ বিএনপির এখানে একটি শক্তিশালী ভোটব্যাংক সবসময়ই ছিল। শুধুমাত্র মহাজোট-জোটগত সমীকরণ এবং নির্বাচন ব্যবস্থার নানা ঘাটতির কারণে বিএনপির প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়েছেন।
আমরা বিশ্বাস করি পরবর্তী নির্বাচনে এই আসন পুনরুদ্ধার সম্ভব। সে লক্ষ্যে আমরা মাঠে কাজ করে যাচ্ছি। দল থেকে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক, আমরা তার পক্ষেই একযোগে কাজ করব।
তিনি আরও বলেন, আমি নিজেও একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী। যদি দল আমাকে মনোনীত করে, তবে এই এলাকার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা , মাদকদ্রব্য থেকে যুব সমাজকে রক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর করতে সর্বশক্তি নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ও বিগত চারবারের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা বলেন,এখানকার প্রধান সমস্যা হলো নদী ভাঙন। এই এলাকাকার তিনদিকে যেহেতু ভারতের অবস্হান সেই ক্ষেত্রে মাদকের সমস্যাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী নির্বাচনে আসনটি জিততে আমি দীর্ঘদিন থেকেই মাঠে আছি। বিএনপি যেহেতু একটি বড় দল এখানে প্রার্থীর সংখ্যা বেশী থাকবেই।দলে আমার বিরুদ্ধে গড়ে উঠা গ্রুপিং নিয়ে আমি ভাবছি না। অনেক লোভ লালসা উপেক্ষা করে আমি শহীদ জিয়ার আদর্শকে ধারন করে বিএনপিকে আঁকড়ে ধরে আছি।
গত ২৪ এর ডামি নির্বাচনে আমাকে নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্য বিভিন্ন ভাবে ভয় দেখানো হয়েছিল সুযোগ সুবিধার অফার দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আমি তাদের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে ফ্যাসিষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাঠে ছিলাম। আমি কথায় বিশ্বাসী নই কাজে বিশ্বাসী। আমি বিএনপির মনোনয়ন পেলে যারা বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে ছিল তাদেরকে সাথে নিয়ে নির্বাচনের মাঠে কাজ করে যাব। আর আল্লাহর রহমতে যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই আমি আমার সংসদীয় এলাকার জন্য এমন কিছু করে যেতে চাই আমার মৃত্যুর পরেও যেন এই অঞ্চলের মানুষ আমাকে স্মরণে রাখে।